কার্গো ভিলেজে আগুন
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২৬ এএম
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ভয়াবহ ঘটনার ৪ দিন পার হলেও অগ্নিকাণ্ডের উৎপত্তিস্থল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তদন্ত কমিটিও নিশ্চিত হতে পারেনি কার্গো ভিলেজের কুরিয়ার ওয়্যার হাউসের ভেতর বা বাইরে থেকে আগুনের সূত্রপাত কি না।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, গতকাল মঙ্গলবারও তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ধারণার ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, কুরিয়ার গোডাউনের ইমপোর্ট কুরিয়ার সেকশন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার দিন আন্তর্জাতিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে এবং কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন মালিকরা।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস শুল্ক গোয়েন্দা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে গঠিত পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ অব্যাহত রেখেছে। গতকালও একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে। এর আগে গত সোমবার ঘটনাস্থল থেকে ২১ ধরনের আলামত সংগ্রহ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাছাড়া আগুনের ক্লু উদঘাটনে আশপাশে থাকা সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহেরও চেষ্টা করছে তারা।
এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের সামনে গতকালও বাতাসে ছিল পোড়া গন্ধ। চার দিন আগেও যে এলাকাটি ছিল কর্মব্যস্ত, সেখানে আজ শুধুই দীর্ঘশ্বাস। বসে থাকতে দেখা গেছে কুরিয়ার কর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট থেকে শুরু করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। তারা বলছেন, এই আগুন লাগার ঘটনায় আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।
মুখ খুললেন বেবিচক চেয়ারম্যান
৪ দিন নীরব থাকার পর গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের সূত্রপাত ইমপোর্ট কুরিয়ার সেকশন থেকে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত নই। অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। এই কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পেলে আমরা জানব কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটল। আশা করছি, এ তদন্ত থেকেই ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা মিলবে।’
বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের আরও দল যোগ দিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আনুমানিক দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে প্রথমে টাওয়ার থেকে ধোঁয়া দেখা যায়, এরপর খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। আগুনের সময় উত্তর পাশে বিমানের হ্যাঙ্গার এবং দক্ষিণ পাশে মূল টার্মিনাল ভবন ছিল। কিন্তু আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় আগুন সেই অংশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েনি। আল্লাহর রহমতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ফায়ার সার্ভিস চেষ্টা করেছিল আগুন যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। তবে সঠিক তথ্য না থাকায় ফায়ার ফাইটাররা ঝুঁকি নিতে পারেননি। শুরুতেই সিভিল এভিয়েশনের ফায়ার ফাইটার ঠিকভাবে কাজ করলে অগ্নিকাণ্ড এত বড় হতো না।
আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট একে এম শরীফ উল হায়দার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আন্তর্জাতিক কুরিয়ারগুলোর ওয়্যার হাউস (গোডাউন) অংশের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে সিভিল এভিয়েশন। আমরা জায়গাটির ভাড়াটিয়া মাত্র। ওই গোডাউনে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের ৪২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর ওয়্যার হাউসের সংখ্যা ৬০টি। কোনো কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের একাধিক ওয়্যার হাউস রয়েছে। ঘটনার দিন কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর কার্যক্রম বেলা ১টায় বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা কর্মচারী ছিল না। বেলা সোয়া ২টায় আগুন লাগে। আমাদের প্রশ্ন, বিমানবন্দরে আগুন লাগলে সেটি নির্বাপণের জন্য ভেতরে সিভিল এভিয়েশনের ফায়ার ফাইটার ইউনিট রয়েছে। তাহলে আগুন কেন এত বড় হলো?’
কাজে আসেনি অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র
তদন্ত কমিটি তথ্য পেয়েছে কার্গো ভিলেজে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র থাকলেও সেগুলো কোনো কাজে আসেনি। বেবিচক বলছে, কার্গো ভিলেজ এলাকায় ১৪০টি অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র ছিল। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, তাদের প্রতিটি ওয়্যার হাউসে পাঁচটি করে অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র থাকে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, যেকোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, ওই এলাকায় প্রায় ১৪০টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল। আমরা কাগজপত্রে প্রমাণ পেয়েছি, নিয়মিত ফায়ার সেফটি কার্যক্রম চলত। শুধু জুন মাসেই প্রায় ২০০ জন কর্মীকে ফায়ার ড্রিল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’ তারপরও কেন আগুন ছড়িয়ে পড়ল বা নেভানো সম্ভব হলো না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উদ্ধার হওয়া মালামালের তালিকা প্রকাশ
এদিকে কার্গো ভিলেজে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে বিজেএমইএ সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস সামগ্রীর অক্ষত প্রায় ৫০০ মালামালের তালিকা প্রকাশ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তবে অন্যান্য পণ্যের তালিকা প্রকাশ না করায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ সংশ্লিষ্টরা।
বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকাশিত তালিকায় মূলত বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট পণ্যের নাম রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে তাদের বেশিরভাগ মালামাল অক্ষত আছে। পাঁচ শতাধিক মালামালের বিস্তারিত তথ্য তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। মালিকরা ব্যাংকে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে এনবিআরের মাধ্যমে মালামাল নিতে পারবেন। ইতোমধ্যে কিছু পণ্য হস্তান্তর শুরু হয়েছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা নূর-ই আলম বলেন, ‘৯ নম্বর গেট ব্যবহার করে মালামাল ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। আপৎকালীন কাজ হচ্ছে। পুরোপুরি কাজ শুরু হতে সময় লাগবে। তবে আমরা চেষ্টা করছি সাধ্যমতো এগিয়ে নিতে।’
জানা গেছে, পণ্য ডেলিভারিসংক্রান্ত সহায়তার জন্য দুই জন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা হলেন ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার কামরুল হাসান ও বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ম্যানেজার (ইমপোর্ট অপারেশন) ফিরোজ সালাউদ্দিন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব আমদানি প্রক্রিয়ার কাজ পুরোদমে শুরু করতে হবে। এতে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু সমস্যা হবে। কিন্তু সব সমস্যা মেনে নিয়ে হলেও দ্রুত কাজ শুরু করা উচিত।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ৭ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি করা হলেও পুরোপুরি নির্বাপণ করতে ফায়ার সার্ভিসের সময় লেগেছে ২৭ ঘণ্টা। আগুন নেভাতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন।