× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রূপনগরে আগুন

বিষাক্ত ধোঁয়া ও গন্ধে এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি

সাইফ বাবলু, শাহরিয়ার দীপ

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০১ পিএম

বিষাক্ত ধোঁয়া ও গন্ধে এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি

ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে এস আলম ট্রেডার্সের রাসায়নিক গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়া ও ঝাঁজালো গন্ধে এলাকাজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বিষক্রিয়ায় কয়েকজনের অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশপাশের গার্মেন্টস, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ফায়ার সার্ভিস গঠন করেছে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি। 

শিয়ালবাড়ীর ৩ নম্বর রোডে এস আলম ট্রেডার্সের রাসায়নিক গোডাউনে গতকালও ধোয়া ও ঝাঁজালো গন্ধ বের হওয়ায় এলাকার অনেকে শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখ জ্বলার মতো পীড়ায় ভুগছেন বলে জানা যায়। গতকাল সকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন গোডাউনে পানি নিয়ে রাসায়নিক দ্রব্য গলানোর চেষ্টা শুরু করেন তখনই এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়। সকালে পানি দেওয়ার পর গুদাম থেকে কয়েক দফা বিস্ফোরণও ঘটে। 

জানা যায়, পাশের একটি ভবনের ওষুধ কোম্পানির এক নিরাপত্তাকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আগের দিনও আরেকটি গার্মেন্টস কারখানার অর্ধশত শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এভাবে গত কয়েকদিনে পথচারী, আশপাশের ভবনে কাজে আসা শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা অসুস্থ হয়েছেন। 

সরেজমিনে দেখা যায়, শিয়ালবাড়ীর যে রাস্তায় রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগে, তার পাশের ৪ নম্বর রোডে রাইজিং গ্রুপের প্রধান কার্যালয় ও দুটি কারখানা। অগ্নিকাণ্ডের পরদিন কার্যক্রম চালু করা হলেও ঝাঁজালো ধোঁয়ার কারণে পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশের ২ নম্বর রোডে রয়েছে বিইউবিটি, আর ২, ৩ ও ৪ নম্বর রোডজুড়ে প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান ও হোটেল তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। 

৪ নম্বর রোডের একটি ভবনে এসিআইসহ কয়েকটি ফ্যাক্টরি রয়েছে। সেখানে নিরাপত্তাকর্মী জুয়েল খান ধোঁয়ার কারণে অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। রাইজিং গ্রুপের শ্রমিকদের অনেকে একইভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় অফিস ও কারখানা বন্ধ করা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধোঁয়ায় মুখ জ্বালাপোড়া করছে, তাই তারা মাস্ক পরে কাজ করছেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, দোতলা টিনশেড গুদামটিতে ব্লিচিং পাউডার, সালফার ও নাইট্রিক অ্যাসিডসহ বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ছিল। বিস্ফোরণে ছাদ উড়ে গেছে, ভেতরে বিষাক্ত ধোঁয়া আটকে আছে এবং মাঝে মাঝে তা বের হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, ‘কেমিক্যাল গুদামের আগুনটা আসলে সেনসিটিভ বিষয়, যার কারণে আমরা নিজেদের সেফটি বজায় রেখে কাজগুলো করে যাচ্ছি। আগুন নেভাতে একটু সময় লাগবে।’

বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন

আগুন লাগার পর গতকাল তৃতীয় দিনের মতো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সিনিয়র জিএম মনজুর রেজার নেতৃত্বে ৪ জনের টিম। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দ আহমেদ কবীরসহ ২ জনসহ টিমের সদস্যরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। 

পরিদর্শন শেষে বিসিআইসির সিনিয়র জিএম মনজুর রেজা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগুন লাগার পর গোডাউনের ভেরতে অক্সিজেন কমে যায়। ফলে বিস্ফোরণ ঘটে ধোঁয়া বের হয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে থাকা গার্মেন্টসে প্রবেশ করে এবং বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে প্রাণহানি ঘটে। আমরা আজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কেমিক্যাল গোডাউনে কোনো আগুন নেই। তবে ধোঁয়া আছে তবে পরিমাণ কমে আসছে।’ 

তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার কারণে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালগুলো মূলত টক্সিক (বিষাক্ত) হয়ে গেছে। এখানে নাইট্রিক অ্যাসিড আছে, সালফার ডাই-অক্সাইড আছে। এগুলো থেকে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকে অজ্ঞান হয়েছে। তবে ধোঁয়া কমে আসায় ভয়ের কিছু নেই। এটি কাছে গেলে গন্ধ পাওয়া যায়নি। আশা করি, আজ-কালের মধ্যে সব কমে আসবে। তাই আমাদের পরামর্শ, কাছাকাছি না যাওয়াই ভালো।’ 

ফায়ার সার্ভিসের কমিটি

আগুনের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ বুয়েটের রাসায়নিক প্রকৌশলী বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াছির আরাফাত খান, ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন-২-এর সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা, মিরপুর ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং কমপ্লেক্সের পিও কাম অ্যাডজুটেন্ট মো. সাইদুল করিম চৌধুরী, ফায়ার সার্ভিস ঢাকা ২৩-এর ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর সোহরাহ হোসেন, মোহাম্মদপুর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. ফসির উদ্দিন এবং সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন। কমিটিতে আগামী ৭ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। 

মরদেহের অপেক্ষা 

গতকালও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের পাশে স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। নিহত মাহিরা আক্তারের মা ফাতেমা আক্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার বুকের ধনের লাশ কখন পাব জানি না। এর কাছে জিজ্ঞেস করি, ওর কাছে জিজ্ঞেস করি, কেউ কিছু কইতে পারে না। ২ দিন ধরে বসে আছি মর্গে।’ 

মেয়ে নার্গিসের মরদেহ নিতে মর্গে অপেক্ষা করছিলেন বাবা মো. ওয়াজিউল্লাহ। তিনি বলেন, মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহনে। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। কিন্তু কখন মরদেহ পাব, কেউ কিছুই বলতে পারছে না। পালা করে পরিবারের সদস্যরা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মর্গেই কাটাচ্ছেন। 

এদিকে গতকাল সকাল থেকে মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে নিহত পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬টি মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে। সিআইডি থেকে জানা যায়, পরিবারের সদস্যদের নমুনার সঙ্গে মরদেহের নমুনাগুলোর মেলানো হবে। এ প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে ২/৩ দিন সময় লাগতে পারে। পরিচয় নিশ্চিত হয়েই স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আলাদা বুথ স্থাপন করেছে সিআইডি, জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে নিহতদের পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সকলের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

গত মঙ্গলবার মিরপুরের শিয়ালবাড়ীর একটি টিনশেড দোতলা গুদামে আগুন লাগে। এরপর সেখানে বিস্ফোরণ ঘটলে পাশের চারতলা ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে চারতলা ভবনের দোতলা ও তিনতলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা