× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রূপনগর ট্র্যাজেডি

কেমিক্যাল থেকেই আগুন

সাইফ বাবলু

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৩৭ এএম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৬ এএম

কেমিক্যাল থেকেই আগুন

রাজধানীর রূপনগরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে কেমিক্যাল গোডাউন এস আলম ট্রেডার্স থেকেই। গোডাউনের মালিক শাহে আলম নামের এক ব্যবসায়ী। ২ বছর আগে নিজ বাড়িতে গোডাউনটি চালু করলেও নেননি কোনো অনুমোদন। হতাহতের ঘটনায় রূপনগর থানায় মামলা করা হয়ছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া ১৬ মরদেহের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় মিলেছে। পরিচয় নিশ্চিতে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ডিএনএ নমুনা। এদিকে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। আবাসিক এলাকায় কীভাবে কেমিক্যাল কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে, তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন তিনি। এ ছাড়া, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে সাত সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে এই কমিটি।

রূপনগর থানার ওসি মো. মোর্শেদ আলম জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে কেমিক্যাল গোডাউনের মালিক শাহে আলম পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ওয়াশিং প্ল্যান্টের মালিককেও খোঁজা হচ্ছে। 

যা বলছেন স্থানীয়রা

গতকাল বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে শিয়ালবাড়ী ৩ নম্বর রোডের সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। পুরো রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থলে পুলিশও রয়েছে। ভেতরে আরও মরদেহ থাকতে পারেÑ এমন সন্দেহে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে ভিড় করছেন স্বজনরা। ২৯ ঘণ্টা পর গতকাল বিকাল ৪টায় কেমিক্যাল গোডাউনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ভেতর থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া। এলাকাবাসী মুখে মাস্ক পরে চলাফেরা করছেন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আশপাশের হোটেল ও কারখানাগুলো। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আগুনের সূত্রপাত হয় এস আলম ট্রেডার্স নামে কেমিক্যাল গোডাউন থেকেই। ওই গোডাউনটির মালিক স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহে আলম সরকার। টিনশেডের গোডাউনটি ছাড়াও আশপাশে তার আরও একাধিক বাড়ি রয়েছে। ৩ নম্বর রোডের গোডাউনটি ২ বছর আগে চালু করেন তিনি। 

প্রত্যক্ষদর্শী ডাব বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার বেলা ১১টায় হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখেন শাহ আলম সরকারের কেমিক্যাল গোডাউন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে আগুন বের হয়, যা অপরপ্রান্তে ৪ তলাবিশিষ্ট ভবনের কারখানার এক্সস্ট ফ্যানে ছিটকে পড়ে। আর ওই ফ্যানের অংশ দিয়ে ভেতরে আগুন ঢুকে পড়ে। এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই আগুন কারখানাটিতেও ছড়িয়ে পড়ে। 

সুমন নামের অরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি ওই রোডেই ৭ তলা ভবনে থাকা একটি ওয়াশিং ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। ঘটনার দিন বেলা ১১টার দিকে তিনি দেখতে পান এস আল ট্রেডার্সে ধোঁয়া বের হচ্ছে। তখন তাদের ফ্যাক্টরিতে ২০০ শ্রমিক কাজ করছিলেন। মুহূর্তেই বিস্ফোরণ ঘটে আগুন লেগে গেলে ফ্যাক্টরির লোকজন দ্রুত বের হয়ে যায়। তবে তাদের পাশের কারখানার নিচতলার ফটকটি তালাবদ্ধ থাকায় লোকজন বের হতে পারেনি। ওই কারখানায়ই প্রাণহানি ঘটে। 

স্বজনের খোঁজে ১৭ পরিবার ঢামেকে

অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও মরদেহ খুঁজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে এসেছে ১৭টি পরিবার। যাদের খোঁজ করা হচ্ছে তারা হলেনÑ মো. আল মামুন (৩৯), মো. নূরে আলম সরকার (২৩), ফারজানা আক্তার (১৫), নার্গিস আক্তার (১৮), খালিদ হাসান সাব্বির (২৯), আব্দুল আলিম (১৪), রবিউল ইসলাম রবিন (২০), মাহিয়া আক্তার (১৪), জয় মিয়া (২০), মাজিয়া সুলতানা (১৮), আসমা আক্তার (১৩), সানোয়ার হোসেন (২২), মুনা আক্তার (১৬), মৌসুমী খাতুন (২২), মুক্তা (৩৬), তোফায়েল আহমেদ (১৮) ও নাজমুল ইসলাম রিয়াজ (৩৮)। তারা সবাই ওয়াশিং ফ্যাক্টরির কর্মী ছিলেন।

রূপনগর থানার এসআই মোখলেছুর রহমান লস্কর বলেন, ১৬টি মরদেহের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬টির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে, এরপর পরিবারের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে হস্তান্তর করা হবে। 

ছয়টি মরদেহের ময়নাতদন্ত 

১৬টি মরদেহের মধ্যে ছয়টির ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তারা হলেন, মাহিরা আক্তার (১২), মোছা. নার্গিস আক্তার (১৮), সানোয়ার হোসেন (২৫), মো. নুর আলম (২৩), আল মামুন (৩৮) ও মো. রবিউল ইসলাম (২৮) । গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় তাদের ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে ফরেনসিক বিভাগের লেকচারার ডা. ফারহানা ইয়াসমিন। 

২৯ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে

মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে এক পাশের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও কেমিক্যাল গোডাউনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে গতকাল বুধবার বিকাল ৪টায়। তবে সেখান থেকে  থেমে থেমে বের হচ্ছে ধোঁয়া। 

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গোডাউনে কী ধরনের রাসায়নিক বা এগুলোর মাত্রা কী, তা এখনও যাচাই-বাছাই করা যায়নি। পুরো গুদাম বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যে ভরা। পানি ছিটিয়ে এসব রাসায়নিক পরিষ্কার করা হচ্ছে। আমরা সিস্টেমেটিক কাজ করছি। ড্রোন দিয়ে দেখছি এবং আমরা বোঝার চেষ্টা করছি। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) কাজী নজমুজ্জামান বলেন, গতকাল বুধবার সকালে আমরা কেমিক্যাল স্যুট পরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে রাসায়নিক গুদামের দরজা খুলেছি। ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়া রয়েছে। ধোঁয়ার কারণে অভিযান চালানো নিরাপদ নয়। অভিযান শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কেমিক্যাল থেকে টক্সিন ও পুলিং গ্যাস তৈরি হচ্ছে। এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে গেলে মানুষের ত্বক, ফুসফুস, হার্টের সমস্যা হতে পারে। আমরা মাইকিং করছি। স্থানীয়দের বলছি সবাই দূরে থাকুন, নিজেদের নিরাপদে রাখুন। 

গোডাউনটি ছিল অবৈধ

এস আলম ট্রেডার্স নামে কেমিক্যাল গোডাউনটি অবৈধ ছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। মিরপুর এলকায় অবৈধ কেমিক্যাল কারখানাসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা ফায়ার সার্ভিস করেছিল, সেই তালিকায় এস আলম ট্রেডার্সের নামও রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইটেন্যান্স) লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম জানান, ফায়ার সার্ভিস তিনবার ওই গুদামে নোটিস দিয়েছে। নোটিসের পরও গোডাউন চালু থাকায় সেখানে ফায়ার সার্ভিসের অভিযান পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই আগুন লাগে। 

আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গোডাউন নিয়ে প্রশ্ন উপদেষ্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জনবহুল এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম চলতে পারে না। অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি শোক জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। হাসপাতালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেল্প ডেস্কের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে বসে সহযোগিতার বিষয়গুলো দেখবেন। 

সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

রূপনগরে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৭ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে ২ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা করে প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ, দায়দায়িত্ব নির্ধারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব লস্কর তাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা