ঢাকা দক্ষিণ : ওয়ার্ড নম্বর ৪৫
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৪৪ এএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩১ এএম
সড়কবাতির খুঁটির গোড়া একেবারেই ক্ষয়ে গেছে। যেকোনো সময় খুঁটিটি হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে রাস্তার ওপর। ইন্টারনেট ও টিভির তার জট পাকিয়ে জড়িয়ে ধরে এখনও দাঁড় করিয়ে রেখেছে সেটিকে। এই চিত্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রজনী চৌধুরী রোডের ৩১ নম্বর সড়কের। এই সড়কে এলেই অজানা আশঙ্কা চেপে ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. নিয়াজকে। কথায় কথায় তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি এই সড়কেরই একটি বাসায় থাকি। এখান দিয়ে আমাকে প্রতিদিনই চলতে ফিরতে হয়। এই খুঁটিটা যেকোনো মুহূর্তে যে কারও ওপর পড়তে পারে। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শুধু আমি কেন, এখান দিয়ে যাওয়ার সময় এ এলাকার সকলেই অজানা আতঙ্কে থাকে। কর্তৃপক্ষের উচিত এটা দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা।’
স্থানীয়রাই ইট-সুরকি ফেলে চলাচলযোগ্য করেছেন
শুধু রজনী চৌধুরী রোড নয়, ডিএসসিসির ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের সব সড়কেই অব্যবস্থাপনার ছাপ সুস্পষ্ট। গেন্ডারিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত এই এলাকার সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। তার ওপর আছে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের উৎপাত। এই ওয়ার্ডে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ভোটার প্রায় ৩০ হাজার, তবে জনসংখ্যা দেড় লাখের কাছাকাছি। ওয়ার্ডটির আওতায় রয়েছে- ডিস্টিলারি রোড, নামাপাড়া, ধূপখোলা মাঠ, দীননাথ সেন রোড, কেবি রোড, শশীভূষণ চ্যাটার্জি লেন, রজনী চৌধুরী রোড, সরাফতগঞ্জ লেন, এসকে দাস রোড, ঘুন্টিঘর, সীমান্ত গ্রন্থাগার, জহির রায়হান নাট্যমঞ্চ, পুকুরপাড় ও ভাট্টিখানা এলাকা। আয়তন ১৬৪ একর বা ০.৫৪৩ বর্গকিলোমিটার। একসময় পুরান ঢাকার আধুনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও এখন সে সুনাম নেই।
এ ওয়ার্ডের অধিকাংশ সড়কই ভাঙাচোরা। ধরা যাক ৯৩/১ ডিস্টিলারি রোডের কথা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে। দীননাথ সেন রোডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খানাখন্দে ভরা। মহিলা সমিতির সামনের রাস্তা বৃষ্টিতে ভেঙে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল; স্থানীয়রাই ইট-সুরকি ফেলে কোনোমতে চলাচলযোগ্য করেছেন। তাকওয়া ফুড কর্নারের কর্মচারী মো. রাজা রিজভী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি সাত মাস ধরে এখানে কাজ করছি। আসার পর থেকেই দেখছি রাস্তা ভাঙা। বৃষ্টি হলে রিকশা আটকে যেত, আমরা ঠেলে দিতাম। কিছুদিন আগে লোকজন ইট-খোয়া ফেলায় কিছুটা ভালো হয়েছে।’
উন্মুক্ত ড্রেনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
সারাফতগঞ্জ লেন (ববিতা গলি), এসকে দাস রোড এবং কেবি রোডের সড়কেরও একই অবস্থায়। জহির রায়হান নাট্যমঞ্চের পেছনের প্রায় ২০০ মিটার রাস্তা ঢালাইহীন, ময়লা-আবর্জনায় ভরা। সেখানে তিন ফুট প্রশস্ত ড্রেন তৈরি করা হয়েছে বটে, কিন্তু পরিষ্কার না করেই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। তাই বৃষ্টি হলেই পানি জমে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নাট্যমঞ্চের সামনের ড্রেনের কাজও দুই মাস ধরে বন্ধ। উন্মুক্ত ড্রেনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।
ঘুন্টিঘরের কলোনি স্কুলের পেছনে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে। ঘরবাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ে বৃষ্টির পানি। সুয়ারেজের মলমূত্র ভাসতে থাকে। ভাসতে ভাসতে তা ঢুকে পড়ে বাড়িঘরে। ৩৫/সি-এর তিন নম্বর হোল্ডিংয়ের বাড়ির মালিক শোফিয়া বেগম বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই পানি জমে, সন্ধ্যা নামলেই মশা কামড়ায়। প্রায় ১০ বছর ধরে এভাবেই চলছে। সুয়ারেজের লাইন পরিষ্কার না। এটা পুরো নোংরা এলাকা।’
অভিযানেও থামছে না অপরাধ ও মাদক ব্যবসা
ঘুন্টিঘরে শুধু জলাবদ্ধতা নয়, চলছে মাদকের ব্যবসা। স্থানীয়রা জানান, পূর্বপাশে প্রতিদিন ইয়াবা ও হিরোইনের কারবার হয়। আগে রেললাইন বস্তিতে এ ব্যবসা চলত। এখন বস্তি উচ্ছেদ হয়েছে বটে, কিন্তু মাদক ব্যবসা ও সেবন বন্ধ হয়নি। অভিযোগÑ মাদক সম্রাজ্ঞী রহিমার মেয়ে মিনারা ওরফে মিনু ও তার স্বামী মনিরুল হক রবিন এখনও এই কারবার নির্বিবাদে চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হয়ে বেচাকেনা ও টাকা সংগ্রহ করে কালা মজিবর, রানা, আরমান ও জামাই দেলা। রবিন আবার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের পলাতক কাউন্সিলর শামসুদোহার ভাতিজা ও জাতীয় পার্টির নেতা।
তবে গেন্ডারিয়া থানার ওসি গোলাম মর্তুজা দাবি করেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। রবিবার ঘুন্টিঘর থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে চালান দিয়েছি, সোমবার আরও ৭ জনকে ধরা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারাই লাগিয়ে নিয়েছেন সড়কবাতি
ধূপখোলা মাঠের চারপাশের বাতিগুলো চালু করা হয় না। ফলে সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসে, বেড়ে যায় অপরাধের ঝুঁকি। মাঠের পশ্চিম পাশে সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন মার্কেটের নিচে পানি জমে থাকে, জন্ম হয় মশার। বাসিন্দাদের অভিযোগÑ নামাপাড়া ও ধূপখোলা মাঠের উত্তর-দক্ষিণ পাশে নিয়মিত মাদক বিক্রি হয়। আলোহীনতা আর নজরদারির অভাবেই এসব চলছে নির্বিঘ্নে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উত্তর পাশের ডিস্টিলারি রোড খানাখন্দে ভরা। ভাট্টিখানার বায়তুল আকবর জামে মসজিদের সড়কও ভাঙাচোরা। মুরগিটোলা মসজিদের সামনে রাস্তা চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ। কেবি রোডের ৯২ থেকে ৯৯ নম্বর বাসা পর্যন্ত এলাকায় পানি জমে থাকে, নেই সড়কবাতি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিজ উদ্যোগে সড়কে বাতি লাগিয়েছেন। লোহারপুর ইউনিট বিএনপির আহ্বায়ক নাদিম হোসেন কালু বলেন, ‘সড়কে বাতি না থাকার বিষয়টি কয়েক দফা ওয়ার্ড সচিবকে জানিয়েছি। কোনো কাজ হয়নি। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে নিজের খরচে ছয়টা লাইট লাগিয়েছি। কিছু জায়গা মেরামতও করেছি। জনপ্রতিনিধি থাকলে আমাদের দায়িত্ব নিতে হতো না।’ এসকে দাস রোডেও সড়কবাতি অচল হয়ে পড়ে আছে।
যা বলছেন ওয়ার্ড সচিব ও জনপ্রতিনিধি
নাগরিক সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব কামাল পাশা বলেন, ‘কাউন্সিলর না থাকলেও আমরা সর্বাত্মক নাগরিক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এলাকাবাসী কোনো সমস্যার কথা জানালে তাৎক্ষণিকভাবে জোন অফিসকে জানাই। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও বিষয়গুলো শেয়ার করি।’
এলাকার নানামুখী সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল কাদির বলেন, ‘এলাকার অনেক সড়কে বাতি নেই, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষজন আমাদের কাছে আসে। দায়িত্বে না থাকলেও সাধ্যমতো তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।’