মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪৯ এএম
রাজধানীতে অটোরিকশার মোট সংখ্যা কত- এমন প্রশ্নের সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। বিভিন্ন পেশা থেকে অগণিত শ্রমজীবী মানুষ অটোরিকশা চালকের পেশায় ভিড় করেছে। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো প্রায় দখল করে ফেলেছে অটোরিকশা এবং এই স্রোতকে কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছে না। গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত পরিবহনের চালক, মালিক, ট্রাফিক পুলিশ, সাধারণ যাত্রী, পথচারী- সবাই মারাত্মক শঙ্কিত। এই ‘অটোবিস্ফোরণ’ বন্ধের উপায়ও অজানা।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ হচ্ছে বাস বা মিনিবাস। চাহিদা অনুপাতে জোগানের এই ঘাটতিই অটোরিকশার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ।একটি সূত্রমতে, খোদ ঢাকাতেই প্রায় ১৫ লাখ অটোরিকশা রয়েছে। পায়ে চালিত রিকশার ভাড়া ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায়, তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতে মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দিকে ঝুঁকছে। এই অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করে নিতে হয় বিদ্যুতে। এর জন্য অনেকেই এই যানবাহনকে বাংলাদেশের ‘টেসলা’ নামে ডেকে থাকেন। এই ‘টেসলা’য় বিদ্যুৎ খরচের পাশাপাশি ঝুঁকিও বেশি। এই ক্ষুদে যানের কার্যকর ব্রেক সিস্টেম নেই। এই ‘টেসলা’র কারণে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোই ভেঙে পড়েছে। পথে কোথাও শৃঙ্খলা রাখা যাচ্ছে না। তবে এ অটোরিকশায় আয় যেমন বেশি, তেমনি এখান থেকে বিনিয়োগও উঠে আসে দ্রুত। তাই এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে বিপজ্জনক হারে।
রাজধানীর প্রায় শতাধিক অটোরিকশা চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কারোরই যান্ত্রিক এই বাহন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমিনুল নামের এক চালক জানান, তিনি আগে প্যাডেল রিকশা চালাতেন, ৬ মাস ধরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। তার ইতোমধ্যে ২ বার দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এই চালক জানান, কেবলমাত্র তিনি একা না, চালকদের কারওই কোনো অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ নেই, সে সুযোগও হয়নি। কাকরাইল মোড়ে সিএনজিচালক জব্বার মিয়া বলেন, অটোরিকশা চালকদের প্রশিক্ষণ না থাকায়, তাদের বেপরোয়া চালনা ও লেন লাইন না মানায় আমরা বেকায়দায় পড়ে যাই। এতে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে। মালিবাগ এলাকার সিএনজিচালক আক্কাস আলী জানান, অটোরিকশা চালকদের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা যেকোনো মুহূর্তেই লেন পরিবর্তন করে ফেলে এবং পুরো রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
ঢাকার ছোটবড় প্রায় ৫০টি গ্যারেজে কথা বলে জানা যায়, অটোরিকশা ভাড়া দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হয় না। ভাটারার একজন গ্যারেজ মালিক রফিক জানান, আমরা যদি প্রশিক্ষণের বিষয় যাচাই করতে যাই সে ক্ষেত্রে অটোরিকশা ভাড়া দেওয়ার লোক পাওয়া যাবে না। রাজধানীর ব্যক্তিগত এক গাড়িচালক সাজ্জাদ বলেন, অটোরিকশার বেপরোয়া গতি ও নিয়ম না মেনে চালানোর ফলে আমাদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় এবং অটোচালকদের মূল সড়কে উঠে আসার ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এক মাইক্রোবাসচালক শহীদুল বলেন, অটোরিকশার জন্য রাজধানীতে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে গেছে। তারা সড়ক দখলে নিয়েছে।
শান্তিনগর মোড়ে ট্রাফিক বক্সের দায়িত্বরত একাধিক সার্জেন্ট ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্য জানান, গত ১ বছরে অগণিত অটো ঢাকার রাস্তায় নেমেছে। আমরা কোনো আইন প্রয়োগ করে তাদের আটকাতে পারছি না। তাদের গলিতে চলার কথা থাকলেও তারা প্রধান সড়কে চলাচল করছে। এতে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একজন ট্রাফিক পরিদর্শক বলেন, সরকারের অটোরিকশার অনুমোদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ট্রাফিক রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে যতই চাপ হোক, দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। আমাদের এ ছাড়া কিছু করার নেই।
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, এত সহজভাবে যান্ত্রিক যান নিয়ে রাস্তায় নামার নজির পৃথিবীতে নেই। এটা নিয়ে সব সময় রাজনীতি হয়েছে। সরকারের এই যান নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা কখনোই ছিল না। এর পিছনে প্রায় ১০-১৫ হাজার কোটি টাকার মার্কেট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বহুপক্ষীয় স্বার্থ আছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে সামষ্টিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। এটা এখন কেবলমাত্র জীবিকা নয়, একটা ব্যবসা। শুধুমাত্র একটি নীতিমালা দিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার, তাই সরকারকে কৌশলী হতে হবে। নীতিমালা বিষয়ে বিআরটিএ পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অটোরিকশা নিবন্ধনের ব্যাপারে কোনো দালিলিক নির্দেশনা এখনও আমাদের কাছে আসেনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের বহুপাক্ষিক সমীক্ষা করে অটোরিকশার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আমলাদের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেখানে কোনো গবেষণা থাকে না। সরকার নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দেশের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান এর ভেতর ঢুকে পড়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে বর্তমানে ১৫ লাখ অবৈধ অটোরিকশার সঙ্গে আরও কয়েক লাখ বৈধ অটোরিকশা নামলে পরিবহন সংকট তৈরি হতে পারে এবং শহর অচল হয়ে যেতে পারে। মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. জিললুর রহমানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-অ্যাডমিন, প্লানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১) মো, আনিছুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি।