উন্নয়নের খড়্গে বিধ্বস্ত ওসমানী উদ্যান
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:০৯ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:২০ পিএম
উন্নয়নের খড়্গে সৌন্দর্য হারিয়েছে রাজধানীর ওসমানী উদ্যান। প্রবা ফটো
প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ৭ মাস। কিন্তু পেরিয়ে গেছে ৯ বছর। তবুও শেষ হয়নি ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন কাজ। বরং উন্নয়নের বেড়ায় (টিন দিয়ে ঘিরে রাখা) দীর্ঘদিন দৃষ্টির আড়ালে থাকায় রাজধানীবাসী একপ্রকার ভুলতেই বসেছে এই উদ্যানের অস্তিত্ব। অন্যদিকে পশ্চিম অংশ থেকে সড়কের জন্য জায়গা বের নেওয়ায় কমে গেছে উদ্যানের আয়তন। বর্তমানে ঢিমেতালে চলা পুরনো প্রকল্পের পাশাপাশি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজও চলছে এই উদ্যানে। সব মিলিয়ে উন্নয়নের চাপে একপ্রকার বিধ্বস্ত রাজধানীর অন্যতম এই 'ফুসফুস'।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর নামে থাকা উদ্যানটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সদর কার্যালয় নগর ভবন ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের মাঝামাঝি অবস্থিত। ২০১৭ সালে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন এর সংস্কার কাজ উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, পার্কটি এমনভাবে সাজানো হবে যে, কোনো রাগান্বিত ব্যক্তি সেখানে গেলে তার মন ভালো হয়ে যাবে। অর্থাৎ এটি হবে 'গোস্যা বা রাগ নিবারণী' পার্ক। এরপর মেয়র বদলেছে দুইবার, ডিএসসিসিতে বসেছে একাধিক প্রশাসক; তবুও শেষ হয়নি উদ্যানের উন্নয়নযজ্ঞ। এ অবস্থায় ঝুলে গেছে প্রকল্পের কাজ। আটকে আছে ঠিকাদারদের বিলও। টাকা না পেয়ে কাজে গতি আনছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে গোসসা নিবারণের পরিবর্তে উল্টো যেন রাজধানীবাসীর গোসসার কারণ হয়ে উঠেছে পার্কটি।
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ থেমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক উপকরণ ও স্থাপনা অযত্নে পড়ে আছে। এতে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল আইটেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া জনসমাগম ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী না থাকায় মাদকসেবীদের আখড়া হয়ে উঠেছে উদ্যানটি।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, পাঁচটি প্যাকেজে ওসমানী উদ্যানের কাজ চলছে। এর মধ্যে তিনটির কাজ শেষ হয়েছে, দুটির ৮ থেকে ১০ শতাংশ এখনও বাকি। অর্থের অভাবে বাকি কাজ এগোতে পারছে না ঠিকাদাররা। প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯০ কোটি টাকা। পরে আরও দুটি প্যাকেজ যোগ হওয়ায় মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১০২ কোটিতে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়। ২০১৭সালে প্রথম ঠিকাদার 'দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড' তিনটি প্যাকেজের কাজ পায়। কিন্তু কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ২০২২ সালে কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। ২০২৩ সালে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেন; সেই সঙ্গে আরও দুটি প্যাকেজ যুক্ত হয়। 'এনডিই' ও 'সোনার বাংলা' যৌথভাবে এবং 'পিএফ করপোরেশন' পৃথকভাবে কাজের দায়িত্ব পায়।
কাজ চললেও সময়মতো বিল না মেলায় ঠিকাদাররা কাজ শেষ করতে পারেনি। প্রকল্পের সর্বশেষ মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া আটকে যায়। এতে অর্থ ছাড়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়। অনুমোদিত প্রকল্প হিসেবে বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও তালিকায় না থাকায় অর্থ ছাড় সম্ভব হয়নি। এরপর মুখ থুবড়ে পড়ে প্রকল্পটি।
এ প্রসঙ্গে পিএফ করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা তিনটি প্যাকেজে কাজ করছি। ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রায় ২০ কোটি টাকার বিল পাইনি। দেশে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর বিল আটকে গেছে। এর মধ্যে আমাদের এমডি মারা গেছেন। হাতে টাকা নেই। তিনটির মধ্যে একটি প্যাকেজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি ৮৭ শতাংশ সম্পন্ন। বিল পেলে দুই-তিন মাসে কাজ শেষ করা সম্ভব। একই সুরে কথা বলেছেন অপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী নাদিম ভূঁইয়া।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়বে। এ প্রকল্পের অর্থ সরকারি বরাদ্দ থেকে আসছে। নতুন করে চালু করতে হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) বৈঠকে অনুমোদন আনতে হবে। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার কারণেই কাজ থেমে আছে।
আগের প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই উদ্যানে শুরু হয়েছে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ। এ কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের ২৩ জুলাই, শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ ছাড়া উদ্যানের পশ্চিম অংশ থেকে সড়ক নির্মাণ করছে গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়।
পাঁচটি প্যাকেজে উদ্যানের পরিকল্পনায় ছিল-পার্কের ভেতরে জলাধার, চা-কফির দোকান, খেলা দেখার জন্য বড় টিভি স্ক্রিন, সংগীতের ব্যবস্থা, নগর জাদুঘর ও লাইব্রেরি, ইনডোর গেমস ও জিমনেশিয়াম। নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা ও সীমানায় গ্রিল স্থাপন। দুটি পুকুর পাড়ে ঘাটলা, মেডিসিন শপ, ওয়াকওয়ে, পার্কিং, রাতের আলোকসজ্জা, বসার জায়গা, নান্দনিক ফুলের বাগান করারও পরিকল্পনা ছিল।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাঁটার পথের বিভিন্ন স্থানে স্লাব ভাঙা। পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি লেকের পাড় সিরামিক ও কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো হলেও পশ্চিম পাশের নগর জাদুঘর ও লাইব্রেরি ভবনের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। পুরো উদ্যানে এখনও ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়নি। পুকুরে জমেছে শ্যাওলা। বেড়েছে জঙ্গলও।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ওসমানী উদ্যানের প্রকল্প পরিচালক খায়রুল বাকের প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হলে ঢাকা শহরের মধ্যে উসমানী উদ্যান হবে একটি সবুজ উদ্যান। ঢাকাবাসী জলাশয়সহ সবুজ নয়নাভিরাম বিনোদনকেন্দ্র পাবে। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে তিনি জানান, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নীতিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী ঠিকাদার পরিবর্তন ও নতুন ঠিকাদার নিয়োগের জটিলতার কারণে কাজ সম্পন্ন করতে বিলম্ব হয়েছে।
এদিকে উন্নয়ন দ্রুত শেষ করে নগরবাসীর কাছে উদ্যান ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুরান ঢাকা নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ইকবাল কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আর কত অপেক্ষা করবে নগরবাসী? ৭ মাসের সংস্কার ৯ বছরে না হওয়া মগের মুল্লুকের মতো। তৎকালীন মেয়র বলেছিলেন, পার্কটির মনোরম পরিবেশ মানুষের রাগ বা গোসসা কমিয়ে আনবে। কিন্তু সংস্কারের জন্য বছরের পর বছর পার্কটি বন্ধ রাখায় জনগণের মনে উল্টো গোসসা তৈরি হচ্ছে।