রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:১৯ পিএম
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উপলক্ষে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় বইছে আনন্দের বন্যা। ঢাকের তালে মেতে উঠেছে সব বয়সিরা। কিন্তু রাজধানীর ধলপুরে বসবাসরত তেলেগু সনাতনীদের ঘরে টানা তৃতীয়বারের মতো এবারও নেমেছে অন্ধকার আর বিষণ্নতা। দেবী দুর্গার আগমনদ্বার কড়া নাড়লেও তাদের ঘরে আর ফিরে আসেনি আনন্দের পুরনো চিত্র।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪ নম্বর আউটফল তেলেগু কলোনিতে উচ্ছেদ চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। উচ্ছেদের পর ভেঙে পড়ে আউটফলে বসবাসকারী তেলেগুদের ঐক্য। যাদের সিটি করপোরেশনে চাকরি ছিল না, তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় অন্যত্র। তিন দশক ধরে গোষ্ঠীগতভাবে একত্রে বসবাস করছিল তেলেগু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ। সেই উচ্ছেদে ১২৬টি ভূমিহীন পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। মাথা গোঁজার ঠাঁইও হারায় তারা। নানা প্রতিবাদ ও দেনদরবারের পর ডিএসসিসি মাত্র ১০০ গজ দূরে তাদের অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়। এর পর থেকে আজ অবধি ওসব পরিবারে পৌঁছায়নি পূজার আনন্দ।
অস্থায়ী কলোনিতে গিয়ে দেখা গেল, দুর্গা উৎসব ঘিরে নেই কোনো ব্যস্ততা। সাজানো হয়নি ঘরগুলো, দুয়ারে আঁকা হয়নি আলপনা। নেই নাড়ু-মিষ্টান্নের আয়োজনও। তিন বছর ধরে পূজাবিহীন কাটছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জীবন। চারপাশের রঙিন উৎসবের মাঝেও তারা থাকে অন্ধকারে। আগে তাদের আঙিনায় দুর্গাপূজার উৎসবে আলোক জলমল করত। এখন সেই আনন্দ উপভোগ করতে তাদের যেতে হবে অন্য কোনো মণ্ডপে। এই চাপা কষ্ট সবার মাঝে বিরাজ করছে। আউটফল তেলেগু কমিউনিটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অ্যারাম সেট্টি জয়ন্তী বলেন, ঘরবাড়ি উচ্ছেদের পর থেকে আমাদের আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর ঘরে পূজার আনন্দ আর আসে না। আলপনা আঁকি না, উৎসবের আয়োজনও হয় না। নতুন এলাকায় তো পণ্ডিতও আসবেন না।
১৪ নম্বর আউটফল তেলেগু কলোনি সমাজ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মাঙ্গালগীরী গুরমতি (কামাল) বলেন, ৩০ বছর ধরে একসঙ্গে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, গণেশপূজা আর হোলি উৎসব পালিত হতো। পুরো এলাকা ভরে উঠত উৎসবের আমেজে। কিন্তু উচ্ছেদের পর সেই চিত্র এখন অতীত। যারা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তারা পৃথকভাবে কোনো পূজার আয়োজন করতে পারছেন না।
১২৬টি পরিবারের বসবাসের জায়গায় নেই। কোনো নাগরিক সুবিধা নেই। তাদের জন্য রয়েছে মাত্র ২০টি অস্থায়ী শৌচাগার, একটি টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি, আর খোলা জায়গায় গোসলÑ এভাবেই চলছে জীবন। বৃষ্টিতে জমে থাকা কাদা পানি, মশার উপদ্রব আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে প্রতিদিন ভুগছেন তারা। নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় কলোনিতে বহিরাগত প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। শিশুর খেলা, নারীর চলাফেরাÑ সবই আজ শঙ্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অস্থায়ীভাবে ধলপুরে বসবাসরত তেলেগু জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আবেদন করেছে তাদের জাতীয় সংগঠন ‘তেলেগু কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক ইউকে নন্দম জয় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উচ্ছেদের পর থেকে ১২৬টি পরিবার অমানবিক জীবনযাপন করছে। ভাষা, পেশা ও ধর্ম আলাদা হওয়ায় আমরা গোষ্ঠীগতভাবে বসবাস করি। আমাদের নিজস্ব জমি নেই। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আধুনিক আবাসন নির্মাণ শুরু করলেও ভূমিহীন তেলেগুদের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সিটি করপোরেশন কেবল যাদের চাকরি আছে তাদেরই বাসা দিচ্ছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হলে পরিবারগুলো কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই দুশ্চিন্তায় সবাই দিন কাটাচ্ছে। এর ওপর তেলেগু পরিচয় শুনে কেউ আমাদের বাসা ভাড়াও দেয় না। তাই রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবিÑ ভূমিহীন তেলেগুদের জন্য খাসজমির বন্দোবস্ত করতে হবে এবং শিক্ষিতদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনে যারা কর্মরত, তাদের সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে যার চাকরি নেই, তাকে তো আমরা সুবিধা দিতে পারি না। জায়গারও সীমাবদ্ধতা আছে। তবু ধলপুরের তেলেগুদের জন্য নিরাপদ শৌচাগার নির্মাণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।
দেশে বসবাসরত তেলেগু সম্প্রদায়ের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকা ও উৎসব উদযাপনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ধলপুরে বসবাসরত তেলেগুরা এদেশের নাগরিক। জায়গা না থাকায় পূজা করতে না পারা অমানবিক। তাদের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকা ও উৎসব উদযাপনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তারা কাজ করছে, সমাজে অবদান রাখছেÑ তাদের মানবাধিকার রক্ষায় সরকার, জনগণ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। উচ্ছেদের সময় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। তাই এখন সরকারেরই দায়িত্ব নিতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ব্রিটিশ শাসনামলে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে দক্ষিণ ভারত থেকে তেলেগু সম্প্রদায়কে আনা হয় চা-বাগান, সিটি করপোরেশন ও রেলওয়ের কাজে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে মিউনিসিপ্যালিটিতে শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন আধুনিক ঢাকা। ১৮৬৪ সাল থেকে তাদের অবদান অম্লান। কিন্তু নিজস্ব ভূমি না থাকায় যুগ যুগ ধরে তারা সিটি করপোরেশনের জমিতেই গোষ্ঠীগতভাবে বসবাস করে আসছেন। ১৯৮২ সালে দয়াগঞ্জ তেলুগু কলোনি উচ্ছেদ করে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৮৫ সালে সেখান থেকে সায়েদাবাদ হুজুরবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯১ সালে ধলপুরের ১৪ নম্বর আউটফলে সেমিপাকা ঘর, স্কুল, মন্দির ও গির্জা নির্মাণ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন করে আসছিলেন।