রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৭ এএম
প্রবা ফটো
রাজধানীর ব্যস্ততম বাসাবোর প্রধান সড়কের মাঝখানে খোলা পড়ে আছে একটি ম্যানহোল। আশপাশে কোনো সতর্কবার্তা নেই। স্থানীয়রা অব্যবহৃত একটি পানির জার দিয়ে জায়গাটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। খোলা ম্যানহোলের পাশ দিয়েই ছুটে চলেছে অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, বাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু এই একটি নয়, পুরো বাসাবো জুড়েই এমন দৃশ্যের দেখা মিলবে। অসতর্ক পথচারী বা যানবাহন যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। রাজধানীবাসীর জীবনে এ এক নতুন আতঙ্ক।
বাসাবো প্রধান সড়কে ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকার ক্ষোভ প্রকাশ করে রিকশাচালক ফরিদ মিয়া বলেন, 'কয়েক দিন ধরেই দেখছি এখানের ঢাকনা গায়েব। একটু বেখেয়ালেই রিকশা সোজা গর্তে পড়বে। বৃষ্টির পানিতে তো রাস্তায় পানিও জমে। তখন এ রকম গর্ত এড়ানোও তো মুশকিল। আর রাতে যদি কোনো গাড়ি এই খোলা গর্তে পরে তাহলে চিন্তা করেন তো কত বড় বিপদ!’
শুধু বাসাবোতেই নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকার সড়ক থেকেই একের পর এক উধাও হচ্ছে ম্যানহোলের ঢাকনা। বড় রাস্তা কিংবা অলিগলির ম্যানহোলের ঢাকনাগুলোও বাদ পড়ছে না। পথচারী ও যানবাহনের জন্য যা হয়ে উঠছে লুকানো ফাঁদ। প্রতিনিয়ত এসব ম্যানহোলে পড়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে। আহত হচ্ছেন পথচারী, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহন।
প্রতিটি খোলা ম্যানহোলকেই এক একটি মৃত্যুফাঁদ আখ্যা দিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, 'রাতের অন্ধকারে একটি চক্র ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে নিচ্ছে। অথচ কর্তৃপক্ষ শুধু দায় এড়ানোর খেলায় ব্যস্ত।'
গত ১৫ দিন আগে রাজধানীর মীর হাজীরবাগ সিট মার্কেটের বাগিচা মসজিদ-সংলগ্ন সড়কের ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও হয়েছে। খোলা ম্যানহোলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে অটোরিকশা ও সিএনজি। একই এলাকার চৌরাস্তা সিট মার্কেটের এমএস টিটো আইরনের সামনের সড়কে, মীর হাজীরবাগ মাদ্রাসা রোডের ৩০০ মিটার সড়ক থেকেও উধাও হয়েছে চারটি ম্যানহোলের ঢাকনা। শ্যামপুরের ঘুন্টিঘর মোড়ের ম্যানহোলের মুখও দীর্ঘদিন ধরে খোলা। এ সড়কে প্রতিদিন জুরাইন থেকে দয়াগঞ্জগামী অসংখ্য গাড়ি যাতায়াত করে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ম্যানহোলের ঢাকনা নেই সেগুনবাগিচার বেশ কয়েকটি গলিতেও। এর মধ্যে জিটিভির গলির শুরুতেই খোলা পড়ে আছে একটি ম্যানহোল। একইভাবে জিটিভির পেছনের গলিতেও ঢাকনাবিহীন ম্যানাহোলের দেখা মেলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পশ্চিম পাশের গলিতেও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকনাবিহীন রয়েছে একটি ম্যানহোলের মুখ। এ ছাড়া সেগুনবাগিচায় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পশ্চিম পাশের গলির ম্যানহোলেরও ঢাকনা উধাও হয়েছে। শুধু তাই নয়, গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম এলাকায়ও অনেকগুলো ম্যানহোলের ঢাকনা গায়েব।

পথচারীরা জানান, সড়কের একটি বড় অংশ বিভিন্ন কোম্পানির বাসের দখলে। ফলে খোলা ম্যানহোলগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ঢাকনা নেই গুলিস্তানের খদ্দের মার্কেটের উত্তর পাশের সড়কে, দক্ষিণ গাঁও এলাকা, কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ মেইন রোডে নতুন কুড়ি শিক্ষালয় কিন্ডারগার্টেনের সামনে, টুকাটুলির অভয়দাস লেনে, অভয়দাস লেনের মুরাদ সড়কে, ধলপুর তিন রাস্তার মোড় মাতৃসদনের সামনের সড়ক, আরকে মিশন রোড ও গোপীবাগের আব্বাস মেডিসিন সেন্টারের সামনের সড়ক, খিলগাঁও থানার ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নন্দিপাড়া ও মধ্য নন্দিপাড়ার বেশিরভাগ ম্যানহোলেই।
নন্দীপাড়ার বাসিন্দা ওবায়দুল্লাহ বলেন, 'এলাকার কয়েকটি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়ে গেছে, আর কয়েকটি ভেঙে নিচে পড়ে গেছে। এসব গর্ত দিনের বেলা এড়িয়ে চলা সম্ভব হলেও রাতে হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী ফাঁদ। স্থানীয়দের উদ্যোগে দু-একটিতে বাঁশ দিয়ে সতর্কতামূলক চিহ্ন দেখানো গেলেও বেশিরভাগই উন্মুক্ত।'
শুধু সড়কে নয়, বেশ কিছু এলাকার ফুটপাতের ওপরের ম্যানহোলের ঢাকনাও চুরি হয়ে গেছে। গেণ্ডারিয়ার রেলস্টেশনের পূর্ব পাশের সড়কের স্থানীয় বাসিন্দা রেজওয়ান আহমেদ বলেন, রাতের অন্ধকারে চোরচক্র ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে নিয়ে যায়। ফুটপাতগুলোতে ঢাকনা খোলা ম্যানহোলে দ্রুত ঢাকনা বসানো দরকার। না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সড়ক ও অলিগলির উন্মুক্ত ম্যানহোলের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো ঢালাই লোহার হওয়ায় চোরেরা সহজেই তুলে বিক্রি করে দেয়। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ দিলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর চুরি রোধে লোহার ঢাকনার পরিবর্তে ফাইবার প্লাস্টিকের ঢাকনা বসানোর বিষয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চলছে। টেকসই প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে এগুলোই ব্যবহার করা হবে। ফাইবার ঢাকনার বাজারমূল্য নেই। ফলে এগুলো চুরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না।