× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন হাসপাতালই রুগ্‌ণ

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৭ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ঘড়ির কাঁটা রাত ৮টা ছুঁইছুঁই, একে একে নিভে যায় সব বাতি। রোগী-চিকিৎসক চলে যান যার যার বাসায়। অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো ভবন, ছড়িয়ে পড়ে সুনসান নীরবতা। যেখানে থাকার কথা শুশ্রূষার অপেক্ষায় থাকা রোগীর আর্তি, সেবার জন্য নার্স আর চিকিৎসক। সেখানে বিরাজ করে ভুতুড়ে নীরবতা। যেন কেউ কোথাও নেই। তবে দিনের আলোয় পাল্টে যায় পরিবেশ। 

এ দৃশ্য পুরান ঢাকার লালবাগের গৌর সুন্দর রায় লেনে অবস্থিত ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতালের। এখানে মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে দেওয়ার কথা শিশুদের চিকিৎসাসেবা। কিন্তু জনবল সংকটে হাসপাতালটি নিজেই এখন মুমূর্ষু অবস্থায়। 

ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতালে গত চার দিন ধরে চিকিৎসা চলছে ১ বছর ১১ মাস বয়সি ফাতেমার। পাতলা পায়খানা, বমি আর মুখের ঘা নিয়ে ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। কিন্তু প্রতিদিন রাত ৮টার পর তাকে বাসায় নিয়ে যেতে হয়, সকালে আবার হাসপাতালে আনা হয়। এ বিষয়ে ফাতেমার খালা নার্গিস বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচরের সিলেট্টা বাজার থেইকা আইছি। আজকা চার দিন হইল বাচ্চার অসুখ। পাতলা পায়খানা, বমি, মুখে ঘাও। ভর্তি করাইছি চার দিন আগে। প্রতিদিন সকালে আসি, রাতে বাচ্চা ক্লান্ত হইয়া যায়, টেনশন থাকে। এখানে থাকলে তো ডাক্তার ডাকি লগে লগে কিছু বলা যাইত। রাত্রে সমস্যাডা বাইড়া যায়।’ 

হাসপাতালটির মেডিসিন ওয়ার্ডের স্টাফ নার্স উম্মে ফাতেমা পপি বলেন, ‘নাইট শিফটে যদি একজন ডাক্তার থাকতেন, রোগীরা অনেক ভালো সেবা পেতেন। এখন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ভর্তি থাকে, তারপর বাড়ি চলে যায়। সার্বক্ষণিক হাসপাতালে থাকতে পারলে দ্রুত সুস্থ হয়ে যেত।’

১৯৯০ সালে ঢাকাবাসীর শিশুদের নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন এ হাসপাতাল চালু করে। দেড় বিঘা জায়গাজুড়ে চারতলা ভবনের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো থাকলেও মিলছে না পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালে নেই কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ, নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার। সার্জন, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, নার্স, কনসালটেন্ট- কেউই নেই। শিশুদের জন্য আইসিইউও নেই। একজন চিকিৎসকই সামলাচ্ছেন সব বিভাগ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী এখানে ১৩০ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ৭০ জন। তিনটি অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, এক্স-রে রুম, ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই অব্যবহৃত। লাখ লাখ টাকায় কেনা যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার পথে। চিকিৎসক না থাকায় রাত ৮টার পর বন্ধ হয়ে যায় জরুরি বিভাগ। নাইট শিফটে ডাক্তার না থাকায় ভর্তি রোগীদের বাসায় নিয়ে যেতে হয়, আবার সকালে এনে সিটে বসাতে হয়। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি স্বজনদের যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত খরচও গুনতে হয়।

জোড়াতালি দিয়ে চিকিৎসাসেবা চললেও থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত সংস্কার কাজ। দেড়কোটি টাকা খরচ করে হাসপাতালের তৃতীয় ও ৪র্থ তলা মেরামত করছে সংস্থাটি। গত বছরের মে মাসে সংস্কার কাজ শুরু হলেও তা শেষ হয়নি ১ বছরেও। তবে চলতি আগস্ট মাসের মধ্যেই সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ। 

চিকিৎসক ও কনসালটেন্ট না থাকায় কাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে না রোগীরা। চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মহানগর শিশু হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. হামিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘১৩ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা, সেখানে রয়েছে মাত্র ৭ জন। এতে চিকিৎসকদের অনেক চাপ পড়ছে। অনেক কনসালটেন্ট চলে গেছেন। মেডিসিনের দুজন, অ্যানেসথেশিয়া কনসালট্যান্ট, রেডিওলজি কনসালট্যান্ট- কেউ নেই। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও পরামর্শক না থাকায় রাতে রোগী ভর্তি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ভর্তিকৃত রোগীর অবস্থা খারাপ হলে কনসালট্যান্ট ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।’ 

ডা. খাতুন নিজে একজন মাইক্রোবায়োলজি ও প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ। তিনি প্যাথলজির কাজের পাশাপাশি পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। সরকার যদি শূন্য পদগুলো পূরণ করে, তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

তীব্র জনবল সংকটে ভেঙে পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আরও দুটি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা। সেখানেও রোগীর সমাগম থাকলেও চিকিৎসক, নার্স ও কনসালট্যান্টের ঘাটতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানীর নয়াবাজার বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু সংলগ্ন ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালেও একই দুরবস্থা। 

অনুমোদিত ১৬৬ পদের মধ্যে ৯২টি পদই শূন্য। প্যাথলজিতে দেড় মাস ধরে নেই কোনো কনসালট্যান্ট, রেডিওলজিতেও পদ শূন্য রয়েছে ৫ মাস ধরে। গাইনি কনসালট্যান্টকেই পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। জনবল কাঠামো অনুযায়ী এ হাসপাতালে ১৩৬ জন কর্মী থাকার কথা থাকলেও তা নেই। নেই স্টোর অফিসারও। 

ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে শয্যা ১৫০টি। এখানে ৩১ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। করোনা মহামারির সময় এ হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছিল। হাইফ্লো অক্সিজেন সরঞ্জামও বসানো হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে জনবল সংকটে। 

নাজিরাবাজার মাতৃসদন প্রসূতি মায়ের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এ প্রতিষ্ঠানেও রয়েছে জনবল সংকট। ৩১ শয্যার এ হাসপাতালে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালের অনুমোদিত ৩৫ পদের মধ্যে ৯টি পদই শূন্য। নরমাল ডেলিভারি হয় ২৪ ঘণ্টা, তবে সিজার কার্যত বন্ধ।

শুধু জনবল নয়, কমানো হয়েছে হাসপাতালগুলোর বাজেটও। গত অর্থবছরে মহানগর জেনারেল হাসপাতালের বাজেট ছিল ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, এবার (২০২৫-২৬) তা কমিয়ে আনা হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখে। শিশু হাসপাতালের বাজেট ৯৩ লাখ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখে আর নাজিরাবাজার মাতৃসদনের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৪ লাখ টাকা। 

ডিএসসিসির অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন বলেন, ‘সব কয়টি হাসপাতালেই জনবল সংকট রয়েছে। এজন্য আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রসিড করেছি। ১৫ জন ডাক্তার নিয়োগের অনুমোদনও আনা হয়েছে। নিয়োগ পেলে সমস্যার সমাধান হবে।’

এদিকে ডাক্তার নিয়োগের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে চলতি মাসেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়ে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি হাসপাতালে আমরা গিয়েছি। সেখানে চিকিৎসাসেবার অনেক সুবিধা থাকা সত্ত্বে জনবল না থাকায় রোগীরা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। ডাক্তার নিয়োগের ছাড়পত্র পেয়েছি, এখন বিজ্ঞাপন দিয়ে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা