বাজারদর
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ০১:০৪ এএম
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কার মধ্যে রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে যেন আগুন ধরেছে। শুধু সবজি নয়। মাছ-মাংস, ডিম, চাল সবকিছুর দামই বাড়ছে। বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। ডিমের ডজনে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। বাজারের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি স্থির ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য নতুন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর জোয়ার সাহারা ও খিলক্ষেত বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য- সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে। তারা বলছেন, বৃষ্টি ও বন্যায় আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দামের ওপর চাপ পড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, শিম ৮০-১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০, বরবটি ১০০, ঝিঙা ৮০, পটোল ৯০, ধুন্দল ৮০, টমেটো ১৮০, মিষ্টিকুমড়া ৬০, মুলা ৮০, করোলা ১০০, ঢেঁড়স ৯০, শসা ১০০, লম্বা বেগুন ২০০, কাঁচামরিচ ২৮০ ও গাজর ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব সবজির দাম তুলনামূলক কম ছিল।
খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, সবজির সরবরাহ কমে গেছে। চারদিকে পানি, অনেক জায়গায় ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। আড়তেই যখন বেশি দামে কিনতে হয়, তখন খুচরায়ও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই।
বাজার করতে আসা গৃহিণী রাশেদা বলেন, আগে বাজারে গেলে ৫০০ টাকায় দুই দিনের সবজি হয়ে যেত। এখন এক দিনেরও হয় না। দাম শুধু বাড়ে, কিন্তু আমাদের বেতনে কোনো পরিবর্তন আসে না। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করে চড়া দামে সবজি কিনে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সবজির পাশাপাশি ডিমের দামও বেড়েছে। সাদা ডিমের ডজন ১৪০ টাকা, বাদামি ডিম ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে ১০ দিন আগেও ছিল ১২০-১৩০ টাকা।
ডিম বিক্রেতা আশরাফুল বলেন, সবজি ও মাছের দাম বেশি হলেই মানুষ ডিম বেশি কেনে। এই চাহিদা একবারে বেড়ে গেলে আমরাও বেশি দামে কিনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করি।
বাজারে গরুর মাংসের কেজি ৭৪০ টাকা, খাসি ১১০০, দেশি মুরগি ৬০০-৬২০, ব্রয়লার ১৭০-১৮০ এবং সোনালি মুরগি ৩২০-৩৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা পরিবহন ব্যয়, পশুখাদ্যের দাম এবং মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধিকে এর জন্য দায়ী করছেন।
মাছের দামও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। বড় ইলিশের কেজি ২৪০০-২৫০০ টাকা, ছোট ইলিশ ১৫০০-১৮০০, বড় রূপচাঁদা ১৬০০, ছোট রূপচাঁদা ১০০০, রুই ৩৫০-৪০০, কাতলা ৭০০-৮০০, পাঙাশ ৩০০, বোয়াল ৯০০, তেলাপিয়া ৪০০-৪৫০ এবং শিং মাছ ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মাছ বিক্রি করা নূর মোহাম্মদ বলেন, বৃষ্টিতে নদী-খালে মাছ ধরা কমেছে, উৎপাদনও কমে গেছে। আড়তে গিয়ে বেশি দামে কিনতে হয়, আবার গাড়িভাড়া দিয়েও আনতে হয়। তার ওপর কর্মচারীর বেতনÑ সব মিলিয়ে লাভের জন্য দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
দেড় মাস ধরে চালের দাম উচ্চপর্যায়ে স্থায়ী হয়ে আছে। মোটা চাল ৬০ টাকার ওপরে, মাঝারি মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল ৬৫-৭০, অন্যান্য ৭৫-৮৫ এবং ভালো ব্র্যান্ডের চাল ৯০-১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলগেটে চালের দাম বেড়ে গেছে, সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও যোগ হয়েছে।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা রফিকুল নামে এক ক্রেতা বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ে, কিন্তু আয় বাড়ে না। বাজারে এক হাজার টাকা নিয়ে এলেও ভালো করে কিছু কেনা যায় না।
মাছ কিনতে আসা শাহরিয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। মনে হয়, আবহাওয়ার অজুহাতে অনেকে দাম বাড়ায়। অথচ কোম্পানিতে আমরা বৃষ্টি-রোদে কাজ করলেও বেতন বাড়ে না।
বিক্রেতারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটকে দায়ী করলেও, ক্রেতারা মনে করেন এর আড়ালে মুনাফা বাড়ানোর প্রবণতাও আছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ সংকট থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বাজারে সমন্বিতভাবে দাম বাড়ানো হয়, যা ভোক্তার জন্য বড় চাপ তৈরি করে।
সবজি, ডিম, মাছ, মাংস, চাল সবকিছুর দাম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন বাজার খরচ ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।