× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুটপাত নয়, যেন বিপণিবিতান

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৩ এএম

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৬ এএম

রাজধানীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতের পুরোটা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। বৃহস্পতিবার তোলা। প্রবা ফটো

রাজধানীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতের পুরোটা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। বৃহস্পতিবার তোলা। প্রবা ফটো

নগরজীবনের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো নিরাপদে হাঁটার পথ, অথচ রাজধানী ঢাকায় সেই অধিকার প্রতিনিয়তই লঙ্ঘিত হচ্ছে। পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত ফুটপাতগুলো এখন ভ্রাম্যমাণ দোকান, নির্মাণসামগ্রী ও অস্থায়ী বাজারের দখলে। ফলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে মূল সড়কে, যেখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরে চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারণে ফুটপাত আবার দখল হয়ে যায়। ফুটপাত দখল শুধু জনদুর্ভোগ নয়, বরং আইনের লঙ্ঘন। ফুটপাত দখল শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। ফলে ঢাকা শহরের ফুটপাত আজ পথচারীর নয়, হয়ে উঠেছে ব্যবসার কেন্দ্র।

গত এক সপ্তাহ রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, নিউমার্কেট, মিরপুর, কুড়িল বিশ্বরোডের কাজিবাড়ীর মেইন রোডের পাশে প্রায়ই দেখা যায় কেউ রাস্তা দখল করে ভ্যানে ফল বিক্রি করছেন, কেউ আবার ফুটপাতে শোরুমের গাড়ি রাখছেন। পথচারীদের হাঁটার মতো জায়গা নেই, বাধ্য হয়েই নামতে হয় ব্যস্ত সড়কে। ফলে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা।

রাজধানীর মিরপুর ১০-এ বসবাস করেন রাইসা আক্তার নামের এক বেসরকারি স্কুলশিক্ষিকা। রাইসা বলেন, আমার ছেলে নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে দিয়ে, আমার স্কুলে যাই। রাস্তার দুপাশের প্রচুর কাপড় ও জুতার ভ্রাম্যমাণ দোকান থাকে। দুজন মানুষ একসাথে হেঁটে যাওয়া যায় না। সকাল ও বিকালে অফিস টাইমে এ রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে অনেক চাপাচাপির মুখে পড়তে হয়। এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখে কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

কুমিল্লা থেকে ঢাকায় ভাইবা পরীক্ষায় অংশ নিতে আসেন নাছরিন আক্তার। তিনি বলেন, বাস থেকে নেমে মেট্রোরেলের মাধ্যমে ভাইবা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আমার মাথা গরম হয়ে যায়। ফুটপাতের ওপর ভ্যান বা ছোট দোকান করে ব্যবসা করছে। আমরা যে হেঁটে যাব, সে অবস্থা নেই। একে তো গরম তার ওপর মানুষের ভিড় । এভাবে কি বাঁচা যায়? এগুলোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।

ঢাকার একটি সরকারি কলেজপড়ুয়া রেশমা বলেন, হাতিরপুল থেকে পান্থপথ যাওয়ার সময় ফুটপাতে দোকানপাট থাকায় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। পাশে গাড়ি এসে হর্ন বাজাতে থাকে, ভয়ে সরে দাঁড়াই। অনেক সময় দুর্ঘটনার কাছাকাছি চলে যাই। তা ছাড়া রিকশাগুলো রাস্তার পাশে এমনভাবে রাখা থাকে- কেউ হাঁটতে গেলে শরীরে চাকা লাগে। অনেক সময় এমন হয় গাড়ি কাছে এসে হর্ন দেয় তখন তো ভয়ে আঁতকে উঠি। ফুটপাত দিয়ে হাঁটব- সে অবস্থা নাই। দুপাশে জুতার দোকানে মানুষ দাঁড়িয়ে কিনছে। 

রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ছোট ভ্যানে বই বিক্রি করেন আবদুল হালিম। ফুটপাতে দোকান বসানোর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা তো মানুষ। আমাদেরও খেতে হয়। এত টাকা দিয়ে ঘর বা দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করার সামর্থ্য আমার নাই। অল্প পুঁজি। তা দিয়ে কিছু মাল কিনে এনে তা বিক্রি করে যা পাই, তা দিয়ে বউ-জি নিয়ে কোনো রকম দিন কাটাচ্ছি। তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, সরকার যদি আমাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরাও রাস্তা ছেড়ে দিতাম। 

নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানের সামনের ফুটপাতে কসমেটিকস বিক্রি করেন শফিকুল আলম। তিনি জানান, এখানে বিক্রি ভালো হয়, তাই দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসা করছি। ফুটপাতটা সরু হওয়ায় মানুষ চলাফেরায় একটু অসুবিধা হয়, সেটা জানি। তবে মার্কেটের মালিককে আগে কিছু টাকা দেওয়ার পর থেকেই এখানে বসতে পারি। শফিকুলের বক্তব্যে স্পষ্টÑ ফুটপাত দখলের পেছনে রয়েছে এক ধরনের অঘোষিত বোঝাপড়া। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বই কিনতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নীলক্ষেতের ফুটপাতে এত মানুষ থাকে যে, একজনকে আরেকজন ঠেলে চলতে হয়। পাশেই হাঁটার রাস্তায় দোকান বসানো হয়েছে। বই, কসমেটিকসসহ নানা জিনিসপত্র নিয়ে বসে আছে অনেকে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকায় আছে। ফুটপাতের এমন দখলবাজি রাজধানীর নাগরিক জীবনের জন্য প্রতিনিয়ত ঝুঁকি ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। আমি নিজেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছি। 

ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৮৩ ধারা জনসাধারণের নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো জনসাধারণের রাস্তা, জলপথ বা উন্মুক্ত স্থানে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বা স্থাপন করে, যা জনসাধারণের চলাচলের জন্য বিপজ্জনক বা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি করে, তাহলে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হলো ২০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। পুলিশ অভিযোগ দায়ের করলে আদালত সরাসরি বিচার করতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী, এই ধরনের মামলার বিচার করতে পারেন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে ঢাকায় ১২৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছে ১২৮ জন এবং আহত হয়েছে ২০৩ জন। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৫৫৭টি, যার ফলে নিহত হয়েছে ৫৬৬ জন এবং আহত হয়েছে ৭৫৬ জন। বিআরটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব দুর্ঘটনার একটি বড় অংশই ঘটেছে যখন সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটতে গেছে। সংস্থাটি দাবি করছে, নগর ব্যবস্থাপনায় দ্রুত হস্তক্ষেপ না করা হলে এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি মিডিয়া) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেছেন, আমরা নিয়মিতভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করে আসছি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলের অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পাশাপাশি যারা বারবার অবৈধভাবে দখল করে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এখনও আমাদের উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এটি অব্যাহত থাকবে। আমরা চাই নাগরিকরা যেন নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন এবং কোনোভাবেই যেন সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি না হয়। সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে আমরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ফুটপাত দিয়ে এখন সাধারণ নয়, অসাধারণ মানুষও হাঁটতে পারে না। এই সমস্যা নিরসনে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে ৩০টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে এবং এ অভিযান ভবিষ্যতেও চলবে বলে জানান তিনি। কিছু জায়গা ইতোমধ্যে দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সংসদ ভবনের সামনের ফুটপাত একসময় দখল ছিল, এখন সেখানে আর কোনো দোকান নেই। তবে এখনও কিছু জায়গায় চাঁদাবাজির মাধ্যমে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই অভিযান কতদিন ট্রাফিক বা ক্রাইম পুলিশের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব? এসময় তিনি জানান, একটি স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটার সময় এসেছে এবং এজন্য ইতোমধ্যে সিটি পুলিশের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তার আশা, এটি তার মেয়াদকালেই চালু হবে এবং ঢাকাবাসীর জন্য এটি একটি বড় পরিবর্তন বয়ে আনবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আগেও আমরা দেখেছি ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি চলে। এরপরেও ভাবছিলাম কীভাবে এই ফুটপাতগুলো সাধারণ মানুষের উপযোগী করা যায়, কিন্তু সেটাও সম্ভব হয়নি। যেখানে-সেখানে হকার বসতে পারবে না— কোথায় কতটুকু জায়গায় বসবে, সেটি একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। হকাররা কোথায় এবং কীভাবে বসছে— এই বিষয়গুলো নিয়মের আওতায় আনলেই ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ঢাকার সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম ফুটপাত নিয়ে কিছু প্রোগ্রাম করেছিলেন, কিন্তু কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করেননি। সরকার যদি আন্তরিকভাবে কাজ করে, তবে ফল পাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, যারা ফুটপাত থেকে মাসোহারা নেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। উদাহরণ হিসেবে মোহাম্মদপুরের একজন পুলিশ কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করেন তিনি। কোথায় হকার বসতে পারবে, কোথায় পারবে না সেটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া গেলে শহরের ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা