হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ০৯:১৫ এএম
আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১২:১১ পিএম
শ্রাবণের মেঘলা সকাল; মঙ্গলবার। গতকালের ঘড়ির কাঁটায় তখন সবে সাড়ে ১১টা পার হয়েছে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের রাস্তার ওপরে নির্মিত সুসজ্জিত অস্থায়ী মঞ্চ। তাকে কেন্দ্র করে শতাধিক উৎসবপ্রিয় লোকজনের জটলা। হঠাৎ নেমে এলো শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি। এক পশলা এই শ্রাবণের বৃষ্টি রিমঝিম ছন্দ আর তালে তাল রেখে সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘৩৬ জুলাই উদযাপন’ আয়োজন। এ গোষ্ঠীর শিল্পীরা কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করে ‘এই দেশ আমার বাংলাদেশ, আমার ভালোবাসা’, ‘আয় তারুণ্য আয়’, ‘যাদের জন্য পেলাম আবার নতুন বাংলাদেশ’, ‘জারিগান’সহ ইসলামিক সংগীত। আর এমনই সব দেশাত্মবোধক ও জুলাই অভ্যুত্থানের গানে গানে জেগে ওঠে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি পুনর্জাগরণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘৩৬ জুলাই’ উদযাপনের আয়োজন। যে আয়োজনের সহযোগিতায় ছিল জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ফ্যাসিস্টের পলায়ন উদযাপন, ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ, স্পেশাল ড্রোন ড্রামা ‘ডু ইউ মিস মি?’সহ নানা আয়োজন চলতে থাকে। দিগন্তজোড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে হেসে ওঠে সূর্য; ভূবন ভোলানো হাসি। ঠিক এমন সময় মঞ্চে আসে ‘কলরব শিল্পীগোষ্ঠী’। তারা পরিবেশন করে ‘তোমার কুদরতী পায়ে’, ‘দে দে পাল তুলে দে’, ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’, ‘ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি’ ও ‘দিল্লি না ঢাকা’। পরে কণ্ঠশিল্পী নাহিদ ইসলাম গেয়ে শোনায় ‘পলাশীর প্রান্তরে’ ও ‘আজ ৩৬ জুলাই’ শীর্ষক দুটি গান। এরপর শিল্পী তাশফি পরিবেশন করেন ‘নোঙর তোল তোল’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ ‘চল্ চল্ চল্’ ও ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ শীর্ষক গান।
বৃষ্টির পরে প্রকৃতিতে শুরু হওয়া ভ্যাপসা গরমের মধ্যেই মঞ্চে একের পর এক শিল্পীর পরিবেশিত গান আর তার ফাঁকে ফাঁকে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাড়া জাগানো সব স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ‘৩৬ জুলাই’ উদযাপনের অনুষ্ঠানস্থল। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে উৎসবপ্রিয় মানুষের উপস্থিতি। বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি গগনছেয়ে নেমে আসা কয়েক পর্বের শ্রাবণের গুঁড়িগুঁড়ি-ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। আর দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই মানুষের ভিড় গিয়ে ঠেকে হাজারের কোটায়। সন্ধ্যায় উপচে পড়ে সেই ভিড়। আর এর সঙ্গে সঙ্গে যেন জেগে ওঠে গত বছরের সেই উত্তাল জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো।
গতকাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই পুনর্জাগরণের এমনই আয়োজনে উপস্থিত অনেককে বলতে শোনা গেলÑ এই হলো জুলাই আন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান, হাজার মানুষের মুক্তির গান। ফিরে ফিরে আসুক গণমানুষের মুক্তি আর বিজয়ের আনন্দ চেতনায়। গতকাল দুপুর ঠিক ২টা ২৫ মিনিটে গ্যাস বেলুনের খেলনা হেলিকপ্টার উড়িয়ে হাজারো মানুষ পালন করল গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। এই সময় উপস্থাপকদ্বয় মঞ্চে স্লোগান ধরেনÑ ‘পালায়ছেরে পালায়ছে, শেখ হাসিনা পালায়ছে’, ‘শোন মহাজন, আমরা অনেকজন’, ‘কথায় কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপ-দাদার’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’সহ ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সময়ের নানা স্লোগান।
শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত উদযাপনের পরই মঞ্চে আসে ‘চিটাগাং হিপহপ হুড’ গানের দল। তারা পরিবেশন করে ‘ছি ছি হাসিনা লজ্জায় বাঁচি না’, ‘চেয়েছিল অধিকার, হয়ে গেল রাজাকার’, ‘আমরা আসছি ঢাকা কাপাইতে’সহ কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। এরপরে ‘কথা ক’, ‘হুদাই হুতাশে’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’সহ কয়েকটি র্যাপসংগীত পরিবেশন করেন র্যাপার সেজান। ব্যান্ড শূন্য পরিবেশন করে ‘শত আশা’, ‘বেহুলা’, ‘রাজাহীন রাজ্য’ ও ‘শোন মহাজন’ গানসমূহ। এরপর মঞ্চে ওঠেন কণ্ঠশিল্পী ইথুন বাবু ও মৌসুমি। তারা পরিবেশন করেন ‘কোলাজ সংগীত’, ‘আমাদের বাংলাদেশ’, ‘মা’ (পলাশ)’, ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ (মৌসুমি), ‘এখনো আমরা জেগে আছি’,সহ আরও কয়েকটি গান।
এরপরই ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাগণ, সিনিয়র সচিব, সচিবসহ বিভিন্ন বাহিনী ও দপ্তর সংস্থার প্রধান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ ও ছাত্র প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠের পর সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী সায়ান, ব্যান্ড সোলস, ওয়ারফেজ, বেসিক গিটার লার্নিং স্কুল, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ব্যান্ড এফ মাইনর, কণ্ঠশিল্পী পারশা মাহজাবিন, কণ্ঠশিল্পী এলিটা করিম। দিনভর অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যান্ড শিল্পীদের পাশাপাশি প্রায় ২৫০ জনেরও অধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করেন।
আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল স্পেশাল ড্রোন ড্রামা শো ‘ডু ইউ মিস মি?’। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠিত ‘ড্রোন শো’তে প্রায় ২০০০ ড্রোন উড্ডয়নের মাধ্যমে ২৪-এর জুলাইয়ের গল্প তুলে ধরা হয়। এবং এর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় জাতীয়ভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি ‘৩৬ জুলাই’ উদযাপন।
এদিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের দিন ৫ আগস্টকে স্মরণ করতে নানা আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকা। এদিন শাহবাগে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এই স্মৃতিস্তম্ভে। এ এলাকায় শোভাযাত্রা করেছে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ। জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন মুহূর্তের মোটিফ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা থেকে শোভাযাত্রাটি বের করে শাহবাগ হয়ে টিএসসি ঘুরে শেষ হয়।