× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গ্যাসের চাপ নেই, চাপে জনজীবন

রাহাত হুসাইন ও কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১১:৪৮ এএম

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৫ ১৫:৪৪ পিএম

গ্যাসের চাপ নেই, চাপে জনজীবন

দিনের বেলা তিতাসের পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় জ্বলে না চুলা, ফলে বন্ধ থাকে রান্নাবান্না। রাজধানীর অনেক পরিবারকে রান্নার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শুধু বাসাবাড়ি নয়; সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও নির্ধারিত সময়ে মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ। ফলে অপেক্ষায় থেকে থেকে লম্বা হয় গাড়ির লাইন, তৈরি হয় যানজট। গ্যাস সংকটে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রাজধানীবাসী। পাল্টে যাচ্ছে তাদের ঘুম ও খাবারের রুটিন। কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি যার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যেও। এদিকে চুলায় গ্যাস না পেলেও মাস শেষে ঠিকই বিল দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ জমছে গ্রাহকদের মনে। বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকার প্রতিবাদে মানুষজন রাস্তায়ও নামছেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও মানববন্ধন হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস না থাকায় আয় কমেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের। ফলে তাদের জীবনমানের অবনমন হচ্ছে। রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক বদল নিয়ে এসেছে গ্যাস সংকট। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট চলছে। গেন্ডারিয়ার কেবি রোড, কাঠবাগিচা, রজনী চৌধুরী রোড, কাজলা, জুরাইন, মগবাজারের দিলু রোড, মিরপুর-৬, মিরপুর-১১, পশ্চিম যাত্রাবাড়ী, উত্তর বাড্ডা, পশ্চিম ধোলাইপাড়, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোড, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, গণকটুলী, ধলপুর, গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ, ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার, তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বনশ্রী, খিলক্ষেত, তুরাগ, বসিলা, নিকেতনÑ এসব এলাকার বাসিন্দারা গ্যাস সংকটে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। কোথাও সকালে গ্যাস থাকে না, কোথাও আসে দুপুরে, আবার কোথাও সন্ধ্যার আগে মেলে না। এমন এলাকাও আছে যেখানে গ্যাস আসে রাত ১২টার পর। গ্যাস না থাকায় হোটেল-নির্ভরতা বেড়েছে। অনেক বাবা-মা খালি পেটে সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, কেউ আবার হোটেল থেকে নাশতা কিনে দিচ্ছেন। কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত বা তেলের চুলায় রান্না করছেন। ফলে ব্যয় বাড়ছে অনেক।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, গ্যাসের অপেক্ষায় দিন কেটে যায়। অনেকেই মাঝরাতে ভাত চড়ান। রান্না শেষ করতে করতে কারও ভোর হয়ে যায়। প্রতি রাতে যে গ্যাস আসবে, সে নিশ্চয়তাও থাকে না। গৃহিণীরা বলছেন, রান্না শেষ হতে হতে ঘড়িতে রাত ৩টা বা তারও বেশি বাজে। পরদিন সকালে ক্লান্ত শরীরে উঠতে হয়। এই ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবারে। রাতে রান্না করলে শিশুরাও জেগে যায়, ঘুম হয় না। ফলে স্কুলে গিয়ে ঝিমায় বাচ্চারা। পুরুষরাও কর্মক্ষেত্রে ঠিকভাবে মনঃসংযোগ করতে পারেন না।

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন কর্মজীবী ও শ্রমজীবী নারীরা। একটি গার্মেন্টসে অপারেটর হিসেবে কাজ করেন সেলিনা বেগম। থাকেন মিরপুর-১১-এর একটি টিনশেডের বাসায়। তিনি বলেন, গ্যাস না থাকায় সময়মতো রান্না করতে পারি না। রাত জেগে থাকতে হয়, না হলে খুব ভোরে উঠে সিরিয়াল দিয়ে রান্না করি। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না, শরীর ক্লান্ত থাকে। গার্মেন্টসে গিয়েও ঝিমাতে হয়। এজন্য সুপারভাইজার অকথ্য ভাষায় গালি দেন। কিন্তু তারা তো মূল সমস্যার কথা জানেন না।

কালিচরণ সাহা রোডের ভাড়াটিয়া সাধনা রানী সাহা বলেন, সকাল ৮টার পর গ্যাস পাওয়া যায় না। দুপুর গড়ালে চুলা জ্বলে। স্কুলগামী ছেলেকে সকালে শুকনো খাবার কিনে দিতে হয়। কাঠবাগিচার মো. কাজল ইসলাম বলেন, লাইন আছে, গ্যাস নেই। স্টোভে রান্না করি। প্রতিদিন ১০০ টাকার কেরোসিন লাগে। 

গ্যাস সংকটের বিষয়টি অনেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা বা সাবেক কাউন্সিলরদের জানাচ্ছেন। গেন্ডারিয়া থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের বলেন, আমার ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় দুপুরের আগে গ্যাস থাকে না। এতে রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। প্রতিদিনই অভিযোগ আসে, আমি মানুষদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিই। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

পশ্চিম যাত্রাবাড়ীতে গ্যাস আসে রাত ১২টার দিকে, কখনও ফজরের আজানের সময়। মদিনা মেডিকেল সংলগ্ন এলাকার জান্নাত বলেন, রাতে রান্না করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তারপরও রাতে একসঙ্গে সকাল ও দুপুরের খাবার রান্না করি। অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাস সংকটের কারণে বাসায় কোনো অনুষ্ঠান করা বা অতিথি ডাকা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এতে ব্যয় আরও বেড়েছে। প্রতি মাসে দুই চুলার জন্য ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দেওয়ার পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনছি। রজনী চৌধুরী রোডের মিতা ইসলাম বলেন, গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ-চালিত চুলায় রান্না করি। এতে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি আসে। গ্যাসের বিলও দিই।

এদিকে গ্যাস সংকট নিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে দরখাস্ত দিয়েছেন দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার বাসিন্দারা। এ বিষয়ে ফায়দাবাদ কল্যাণ সমিতির সভাপতি সফিকুল ইসলাম বলেন, এক বছর ধরে আমাদের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট। আগে রান্নাবান্না করা যেত। এক বছর ধরে ঠিকমতো রান্না করা যাচ্ছে না। গ্যাসের সমস্যা সমাধানের জন্য দুই মাস আগে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। তবুও কোনো ফল হয়নি। 

কাজলা এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় গত ২১ মে সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এতে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলী বলেন, পবিত্র রোজার আগ থেকেই গ্যাসের সমস্যা চলছে। তবে গত ১৫ দিন একেবারেই গ্যাস নেই। এর আগে, চলতি মাসের ২ তারিখে দক্ষিণ সিটির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন করেন। সেখানে বক্তারা জানান, তারা ১৫ বছর ধরে এই সংকটে ভুগছেন।

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ রাখা হয়। অন্য সময় গ্যাস থাকলেও চাপ থাকে খুব কম। ফলে সিএনজি স্টেশনগুলোতে তৈরি হয় গাড়ির দীর্ঘ লাইন। এই লাইন সড়কে গিয়ে তৈরি হয় যানজট। কুড়িল বিশ্বরোড, নর্দা, বসুন্ধরা, মগবাজার, দয়াগঞ্জ, বাড্ডা, শাহজাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার স্টেশনগুলোতে প্রায়ই এ রকম দৃশ্য চোখে পড়ে। 

গ্যাস সংকটে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের আয়ও কমে গেছে। প্রচুর যাত্রী থাকলেও গ্যাস না থাকায় গাড়ি চালানো যায় না। গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। নর্দার চালক বাচ্চু মিয়া বলেন, সকালে গ্যাস নিতে ৩-৪ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। আগে ৭০০-৮০০ টাকা আয় করতাম, এখন সেটা নেমে এসেছে ৪০০-৫০০ টাকায়। বাড্ডার চালক শাহিন রশিদ বলেন, জমা দিয়েছি ১ হাজার ৮০ টাকা, এখনও সেই টাকাই ওঠেনি। মাত্র দুইবার গ্যাস নিয়েছিÑ ৫৫ ও ৮০ টাকার। এখন গ্যাস শেষ, গাড়ি বন্ধ।

গ্যাস সংকট থাকায় ফিলিং স্টেশনে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে শাহজাদপুরের এসটি পাওয়ার লিমিটেডের তমাল ধর বলেন, মেশিনের সামর্থ্য অনুযায়ী এক-চতুর্থাংশ গ্যাসও পাই না। অনন্ত এনার্জির সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম বলেন, রাত ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে কিছুটা ভালো গ্যাস পাওয়া যায়। বাকি সময় মেশিন চালানো যায় না, বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়। পিনাকল পাওয়ার লিমিটেডের ম্যানেজার সৈয়দ নুরুল হাসান বলেন, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ মাত্র ৩০ শতাংশ। মেশিন ঠিক রাখতে একটি বন্ধ রাখতে হয়।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও চাহিদা-সরবরাহে ভারসাম্য আনতে তারা কাজ করছে। এ বিষয়ে সংস্থাটির অপারেশন কন্ট্রোল বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাহমুদ-উর-রহমান ভূঞা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। উৎপাদন অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা বিতরণ কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে। সরকার দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং এলএনজি কার্গোর পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পুরাতন নেটওয়ার্ক পরিবর্তনে একটি প্রকল্প নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। 

এদিকে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক সমন্বয়ক মো. নুরুন্নবী সরকার বলেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন কমে গেছে। তবে সরকার সমস্যা সমাধানে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। গ্যাস সংকট নিরসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই সমস্যা কিছুটা কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা