প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৫ ১৪:৫১ পিএম
নিরাপদ খাদ্য তৈরিতে হোটেল-রেস্তোরাঁ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকের অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এ ব্যাপারে ওয়েবসাইট তৈরি, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু প্রস্তুত করা হচ্ছে। তা ছাড়া উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কী ধরনের কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করছে সেটাও অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে ভাবা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ জুন) সকালে রাজধানীর শাহবাগ নিজস্ব কার্যালয়ে ‘নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণ’ সেবা শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলা হয়। কর্মশালাটির আয়োজন করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জাকারিয়ার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস। কর্মশালায় খাদ্য তৈরি, বাজারজাতসহ বিভিন্ন সেক্টরের ব্যক্তিরা অংশ নেন।
এ সময় প্রদীপ কুমার দাস বলেন, ‘অনলাইন কোর্সগুলো পর্যাপ্ত প্রচার করতে হবে। অনেক সময় আমরা খাদ্যে ভেজাল দেওয়ায় জরিমানা করছি অথচ তাদেরকে খাদ্য প্রস্তুত সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় হয়নি।
তিনি প্রশিক্ষণে শুধু ভিডিও দেখে কোর্স করে চলে যাবে তা হবে না। তখন আমরাই ফালতু হয়ে যাবো। সেজন্য কোর্সগুলো উপযোগী ও প্রয়োজনভিত্তিক হতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের পরীক্ষা সহজ করা যাবে না বরং যথাযথ করতে হবে। যাতে সবাই এটিকে মূল্যায়ন করে। চাকরির বাজার সৃষ্টি হয়।’
তিনি তিনটি ক্যাটাগরির প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, তিন ক্যাটাগির প্রশিক্ষণ রাখতে হবে। তার মধ্যে একটি সাধারণ মানের হোটেল-রোস্তোারাঁর জন্য, দ্বিতীয়টি আরেকটু উন্নত এবং তৃতীয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য করা যেতে পারে। বিদেশে যারা চাকরি করে তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। ফুড গ্রেড প্লাস্টিক, মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ে কোর্স থাকতে হবে। অসময়ে সবজিতে কতটা সার-কীটনাশক ব্যবহার হবে সেটিও দেখতে হবে।
জাকারিয়া বলেন, নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিদেশি ওয়েবসাইটগুলো অনেক সমৃদ্ধ সেখানে আমাদেরকে তাদের সঙ্গে তুলনায় করা যায় না। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে পূর্বে এতটা কাজ হয়নি। সামান্য কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ অল্পকিছু ছাড়া খাদ্যকে দেখভাল করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে নিরাপদ খাদ্য বিশেষজ্ঞ নেই। আমরা কাজ করি, ভুল করি তারপর শিখি নিরাপদ খাদ্য নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ কম। আমরা বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি। আর আমাদের অসুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই হচ্ছে খাবারের ভিত্তি। তখন সর্বনিম্ন ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধইতে হয়। অথচ লাইফবয় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ১০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার। আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব কিনা সেটা ভাবছি।’
‘জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য’ নিশ্চিতের ভিশন নিয়ে কাজ করছে বিএসএফএ। কর্মশালায় জানানো হয় বিএসএফএর কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত যথা- উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ; নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আলোকে বিধি-প্রবিধান তৈরি;
খাদ্য স্থাপনা (হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শিল্প কারখানা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি) পরিদর্শন করে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি; খাদ্য দূষণ, ভেজাল প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা; খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণকারী সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার কার্যাবলির সমন্বয় সাধন এবং জনগণের নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া।
বিএসএফএ সংস্থাটি ৫টি ধাপে সেবা দিয়ে থাকে বলে জানানো হয়। তার মধ্যে রয়েছে-সেবা কাজকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা; সেবা পৌঁছে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো; সেবা পেতে ধাপের সংখ্যা কমানো এবং জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন করা।
বিএসএফএ'র প্রস্তাবিত সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে -ইলেক্ট্রনিক খাদ্য আমদানি সিস্টেম; অনলাইন ফুড সেফটি প্রশিক্ষণ ও রেস্তোরাঁরনগ্রেডেশনের মূল্যায়ন।
বিএসএফএর নতুন পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- নতুন প্ল্যাটফরমে প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা; রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ফ্রি ও পেইড দুইধরনের কোর্স গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া; ডিজিটাল কোর্স ম্যাটেরিয়াল; অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা এবং কোর্স শেষে অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে সার্টিফিকেট দেওয়া।
অনলাইন কোর্সের সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোর্স গ্রহণকারী সুবিধামত সময়ে কোর্সে শেষ করতে পারবে, কোন ব্যাচের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না; অনলাইনে পেমেন্ট করে দ্রুত সেবা গ্রহণ করতে পারবে; অনলাইনে সার্টিফিকেট যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে এবং সময় ও খরচ কমবে। অফলাইনে আগে ৫ দিনের একটি প্রশিক্ষণের জন্য ৫-৭ বার যাতায়াত করতে হতো। আর তাতে আর্থিক খরচ হতো ১০ হাজার টাকা। আর অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিলে যাতায়াতের দরকার নেই। আর আর্থিক খরচ কমে ৫০০ থেকে ১হাজার ৫০০ টাকায় নেমে আসবে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের টিম লিডার ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘স্বল্প সময়ে ১৮ কোটি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়, এজন্য অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অফ লাইনে প্রশিক্ষণ নিলে সময় ও অর্থ দুটিই বাঁচবে। খাদ্যকে নিরাপদ করতে উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবারের টেবিল পর্যন্ত কাজ করতে হয়। আর যারা হোটেল ও রেস্টোরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদেরকে বেশি সচেতন থাকতে হবে। এজন্য প্রশিক্ষণটি অত্যন্ত দরকার।’ নিশাত তাসনিয়া অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে আলোচনা করেন।
জাকারিয়া বলেন, সাধারণ হোটেলের কর্মীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। কেননা এখন তো আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ বেশি নেই। অনলাইনে প্রশিক্ষণ শুরু হলে প্রতিটি হোটেলে কমপক্ষে একজন প্রক্ষিত কর্মীকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। ওয়েবসাইটটি বাংলায় হতে হবে। আর সাধারণ কর্মীদের জন্য তাদের উপযোগী করে কোর্স ঠিক করা হবে। যে কেউ মোবাইল নাম্বার দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্রথমে বিনামূল্যে কোর্স করানো হবে। একসঙ্গে ১৮ লাখ মানুষ হিট করতে পারবে। আর কোর্সের পরীক্ষার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম্বার পেয়ে যাবে।