× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুটপাতে ভাসছে তাদের জীবন

আহমেদ ফেরদাউস খান

প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১০:২৯ এএম

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার পুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দোকানে চলছে কেনাকাটা। সম্প্রতি তোলা

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার পুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দোকানে চলছে কেনাকাটা। সম্প্রতি তোলা

চাকা লাগানো স্যুটকেসে দৈনন্দিন জীবনের হরেক পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. খোকন। তার ডান পায়ের পাতা বাঁকানো, বাঁ-চোখে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। শরীরের ভারসাম্য রেখেছেন সচিবালয়ের প্রাচীরে পিঠ ঠেকিয়ে। জীবিকার প্রয়োজনে ফুটপাতে ফেরি করেন। পুঁজি খুবই সামান্য। হরেক পণ্য বিক্রি করে সংসার চলে। টাকার অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও নেই। তারপরও আকাঙ্ক্ষা, যদি ঋণ পাওয়া যায়। 

সচিবালয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বছর দশেক আগে প্যারাটাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে এক চোখে আর দেখি না। সংসারের খরচ, নিজের চিকিৎসা আর ধারদেনার খরচ মেটাতে চলে আসি ঢাকায়। করোনাকালে সংসারের খরচ মেটাতে অন্ধকার দেখেছি। স্ত্রী আর দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে আছি।’ 

খোকনের মতো ভাসমান অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবনের গল্প প্রায় একই। তাদের আক্ষেপ ও অভিযোগ, কেউ দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসে না। তারপরও অল্প পুঁজির ব্যবসায় সামান্য লাভে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। তারা চান সরকারের সহযোগিতা, চান ব্যবসার লাইসেন্স। যাতে পেতে পারেন সরকারের দেওয়া ব্যবসায়িক সুবিধা। 

গত পাঁচ বছরে দেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিচ্ছেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, এমএফএস প্রভৃতি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করে নিবন্ধিত বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে বিতরণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষুদ্রঋণ। এর মধ্যে এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোই বিতরণ করেছে ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি-এমআরএ’র প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে নিবন্ধিত এমএফআই প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। 

এই খাতে এত ঋণ বিতরণের পরও ভাসমান ঋণ পাচ্ছেন না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণ পাওয়া খুবই সহজ। ব্যাংকিং চ্যানেলে যেসব শর্ত দেওয়া আছে তা পূরণ করলেই পাওয়া যায়। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা হয়তো আবেদন করছে নাÑ এজন্য পাচ্ছে না। তারা যদি নিয়ম নেমে আবেদন করে অবশ্যই পাবে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং চ্যানেল ও এনজিওর মাধ্যমে খুব সহজেই ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ হয়। আগের যেকোনো সময় থেকে এখন ক্ষুদ্রঋণ বেশি বিতরণ হচ্ছে।’ 

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান ফটকের পাশে পসরা সাজিয়ে বসেন আব্দুস সাত্তার। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়েই ব্যবসা শুরু করলেও পরে লোন নিছি। সেই লোন আর সুদ দিতেই এখনও ব্যবসা করতেছি।’

সরকারি-বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওসব ঋণের কাছে হাত বাড়াই না। কেউ কখনও জিগায়ও নাই। দিন কাটতেছে, দু-পয়সা উপার্জন কইরা খাইতাছি।’

অল্প পুঁজির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দেখা মেলে রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় মোড়ে, ফুটপাতে। প্রতিদিনের বিক্রি থেকে যে লাভ হয় তা দিয়েই চলে সংসার। ব্যবসা বড় করতে তারা সরকারের সাহায্য চান। ট্রেড লাইসেন্স না থাকার পরও তারা ক্ষুদ্রঋণ চান। 

জানা যায়, এদের অনেকেই এনজিও বা সমবায় সমিতি থেকে উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়েও বিপাকে পড়েন। তাদেরই একজন উত্তরার নাদিম। তিনি জানান, ‘এলাকার এক সমিতি থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রতিদিন যে বেচাকেনা, তা দিয়ে দিন পার হতো। কিন্তু লাভের সিংহভাগই চলে যায় ঋণের চড়া সুদের কিস্তি দিতে।’ 

ফুটপাতের কাপড়ের ব্যবসায়ী হাসান বলেন, ‘১৫ হাজার টাকা পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করি। গ্রামে বউ বাচ্চা আছে। তাদের দেখতে ইচ্ছা করে, কিন্তু মন চাইলেও পারি না। পেটের টানে কষ্ট কইরা পইরা রইছি ঢাকায়।’

পল্টন মোড়ের ফল ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, ‘ব্যবসা শুরু করেছিলাম অল্প কিছু টাকায়। দিন গেলে লাভ ভালোই থাকত। গেল বছর মেয়ে বিয়ে দিছি। তখন লাখ খানেক টাকা নিছি। সুদ অনেক বেশি। লাভের টাকা এখন কিস্তিতেই যায়।’ 

সাশ্রয়ী মূল্যের জন্য ফুটপাতই স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা। একটা সময় পর্যন্ত এসব পণ্যের নির্দিষ্ট ক্রেতা ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিবর্তনে ক্রেতারও পরিবর্তন এসেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তদেরও অনেকে এখন ফুটপাতে কেনাকাটা করেন। 

নীলক্ষেত মোড়ের দুজন বই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘টুকটাক বেচাকেনা হয়। ক্রেতাদের মধ্যে ছাত্রছাত্রীরাই বেশি। ছেলেমেয়েরা এসে বই দেখে, ভিড় জমায়। বেচাকেনা কম হলেও এটাই ভালো লাগে।’

ফুটপাতের ব্যবসায় জড়িত অনেক মানুষের জীবন জীবিকা। তাদের বিক্রি করা পণ্যগুলো তৈরি হয় ছোট ছোট কারখানায়। এসব কারখানায় নিয়োজিত অসংখ্য শ্রমিক। ফলে কর্মসংস্থানও হচ্ছে অনেক মানুষের। তারা মনে করেন, ব্যবসায় আর্থিক সহযোগিতা পেলে তাদের ভোগান্তি কমত। ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্য পেতে সাধারণেরও সুবিধা হতো। 

এ ব্যাপারে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ফুটপাত ব্যবসায়ীসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা আছেন, তাদের জন্য আমাদের মাইক্রো এন্টারপ্রাইজসহ কিছু প্রজেক্ট আছে। লোয়েস্ট লিমিট থেকে ২০-২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। ব্যক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দেওয়া ঋণের জন্য মাইক্রো ফাইন্যান্সের সদস্য ফর্ম পূরণ করে নিয়মিত বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে হয়। প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে ঋণ দেওয়া যায়, তাহলে দেবে।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘এই ব্যবসায়ীরা খুবই অল্প মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এ টাকা জোগাড়ের জন্য তাদের আনুষ্ঠানিক কোনো চ্যানেল নেই। আনুষ্ঠানিক চ্যানেল থেকে টাকা সংগ্রহ করতে হলে ব্যাংক লোন নিতে হয়। সেটার জন্য যে প্রক্রিয়া, অনেকেরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকে না। এজন্য আত্মীয়-স্বজন, মহাজন কিংবা জমি বিক্রি করে তাদের লোন নিতে হয়।’

ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের নিজেদের পেশার ক্ষেত্রে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ নিতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গরমে একজন শসা বিক্রেতাকে যেমন শীতের সময় সিজনাল ডিমান্ডের ওপর নির্ভর করতে হয়। তেমনি শীতের কাপড় ব্যবসায়ীর গরমে ফ্যাশনেবল পোশাকের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হয়। পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার পরেও খাবারের কোয়ালিটি মেইনটেইন করা, পুঁজির ব্যবস্থা করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে রেখে স্বল্প মূল্যে প্রফিট ম্যানেজ করাসহ নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাদের ব্যবসা করতে হয়। তাদের বড় আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো, বর্ষা বা বন্যায় বিকল্প স্পেস খোঁজা কিংবা গ্রামে ফিরে যাওয়া।’

সরকারের করণীয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ছিন্নমূল এ ব্যবসায়ীরা কী ধরনের পেশায় জড়িত, কোথায় করছে, সেসবের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের মাঝে পুঁজি বিনিয়োগ করা হলে তাদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও গতিশীল হবে।’


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা