× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত রাখাইনরা

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৫ ১৫:৩৪ পিএম

উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত রাখাইনরা

দেশে উন্নয়নের নামে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার রাখাইনসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমা-জমি গ্রাস করে এসব জনসংখ্যাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তাদের আদিভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে। এই ধরনের অন্যায় ও অবিচারের শিকার হয়েছে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার ছ-আনিপাড়ার রাখাইন পল্লীবাসীরা। পায়রা সুমদ্রবন্দর নির্মাণ করতে গিয়ে ৬টি রাখাইন পরিবারের ২৮ জন ব্যক্তিকে বসভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও সরকার কোন সুরাহা করছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার (২৬ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পায়রা সমুন্দ্রবন্দর নির্মাণে উচ্ছেদকৃত ৬ রাখাইন পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন- উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সদস্য চিংদামো রাখাইন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কোষাধ্যক্ষ মেইনথিন প্রমিলা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন ও বিপায়ন খিসা এবং উচ্ছেদকৃত ৬ পরিবারের সদস্যরা।

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, গত ৩ বছরেও উচ্ছেদকৃত পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোন সুরাহা দিতে পারেনি। তাদের বসতবাড়ি, পুকুর, ধর্মশালাসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করার পর  পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও তা পালন করা হয়নি। 

তিনি বলেন, কলাপাড়ায় বিগত দিনে ৬০ হাজার রাখাইন জাতিগোষ্ঠী ছিল। তারা উচ্ছেদ হতে হতে ২-৩ হাজারে নেমে এসেছে। এদেরকে জনশূন্য করা হচ্ছে। তাদের পুকুরগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। বন্দরের বাইরে হলেও ৬টি পরিবারকে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তখন বলা হয়েছিল সাপ মেরে ফেলেছি এক লেজ রাখবো? অর্থাৎ রাখাইন এসব পরিবারকে সাপের লেজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, জাতি হিসেবে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে অবিচার ও অন্যায় করা হচ্ছে। রাখাইনের একজন ভাষাসৈনিক ছিল তার নামে সেতু করার দাবি করা হলেও সরকার তা না করে শেখ কামাল, জামাল ও রাসেলের নামে করেছে। এ কারণে রাখাইন ভাষাসৈনিককেও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, উচ্ছেদকৃত ৬টি পরিবারকে পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত  বাড়িভাড়া হিসেবে প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩১ মাসের বাসাভাড়ার টাকা বাকি রয়েছে। 

এ সময় রোবায়েত ফেরদৌস জানান, তিনি সংবাদ সম্মেলন চলাকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অবসার) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনকে হোয়াটসঅ্যাপ স্মারকলিপি  পাঠালে তিনি তা দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।   

তিনি আরও বলেন, আদিবাসীরা দুর্বল ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে তাদের জমিগুলোকে বার বার হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকার যদি এই ৬ পরিবারকে পুনর্বাসন না করতে পারে তাহলে তারা ১৮ কোটি মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না।

নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া চিংদামো রাখাইন ৭ দফা সমস্যা ও ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-  

রাখাইনদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে কলাপাড়ার কোন রাখাইন পল্লির পাশে পুনর্বাসন করতে হবে; পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মাসে ৫ হাজার টাকা দেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে; অন্যান্য রাখাইন পল্লীর বেদখলকৃত শ্মশানগুলো পুনরুদ্ধার করে, সেগুলোর যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে রাখাইন জনগোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে; রাখাইনদের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানসমূহ নিজস্ব সংরক্ষিত এলাকা কোনভাবেই অধিগ্রহণ করা যাবে না এবং রাখাইন এলাকায় রাখাইন জনগোষ্ঠীর সম্মতি ছাড়া জমিতে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।

মেইনথিন প্রমিলা বলেন, উন্নয়নের নামের আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত রাখাইন পরিবারগুলো। বিগত ৫০ বছর আগে এ অঞ্চলের দেড়শ পাড়ায় লক্ষাধিক জনসংখ্যা ছিল। সেখানকার সিএস জরিপে রাখাইনদের নামে জমি ছিল। এখন এসব জমি বেহাত হয়ে গেছে। বর্তমানে অল্পকিছু পরিবার রয়েছে। বাকিরা নানা সময়ে উচ্ছেদ হয়েছে।

তিনি বলেন, কলাপাড়ায় একটি পাড়ায় ৬টি পরিবার ছিল তাদেরকেও উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রতিটি পাড়ায় দুটি শ্মশান থাকে। কেননা বাইরে কেউ মারা গেলে তাকে অতিথি শ্মশানে ও স্থানীয়ভাবে মৃত্যুবরণকারীদের একটি শ্মশান শেষকৃত্য করা হয়। রাখাইনরা পুকুর থেকে পানি খায়। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রের আগ্রাসনের কারণে ৬টি পাড়া বিলিন হয়ে গেছে। 

মো. জাকির হোসেন বলেন, অফিসারদের থাকার জন্য বিল্ডিং বানানো হয়েছে। অথচ সেখানে কোন অফিসার থাকে না। তারপরও রাখাইনদের উচ্ছেদ করে গুচ্ছগ্রামে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে সরকার। অথচ তাদের সংস্কৃতি আলাদা। তারা গুচ্ছগ্রামে থাকতে পারবে না। বিশেষ অর্থনৈতিক জোনগুলোর মধ্যে  ৯০টি বাতিল করা হয়েছে। এখন এসব জমি মূল মালিকদের ফেরত দিতে হবে।

শামসুল হুদা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাছাই করা হয় রাখাইন, আদিবাসী বা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর  জমিকে ঘিরে। হিসেব করে দেৎা গেছে এসব স্থাপনার ৬০-৭০ শতাংশ জমির মালিক এ শ্রেণির মানুষ। 

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জমি অধিগ্রহণ আইনের চেয়ে বাংলাদেশের অধিগ্রহণ আইন জনবিরোধী ও খারাপ। এ আইনে হাইকোর্টে মামলা করা যায় না। এটি সংবিধানবিরোধী। এসব জমির মালিকরা অধিগ্রহণের টাকা পায় না ও অন্যরা ক্ষতিপূরণ হিসেব নিয়ে যায়। ছয় পরিবারের যতটুকু জমি নেওয়া হয়েছে সেই পরিমাণ টাকা ও অন্যান্য যা ক্ষতি হয়েছে তার সমপরিমাণ জরিমানা দিতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি। আর তাদেরকে অসম্মান ও অপমানের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেন। তাছাড়া অধিগ্রহণের আগে স্থানীয়দের মতামত নিয়ে ও ক্ষতিপূরণের টাকা ফিরিয়ে দিয়ে তারপর জমি নিতে হবে।

চিংদামো রাখাইন বলেন, ‘২৫০ বছর আগে আমাদের আদিপুরুষরা ঝোপঝাড় কেটে আবাসস্থল বানাতে গিয়ে বাঘ-ভাল্লুকের থাবায় প্রাণ হারিয়েছে। আমাদের বিহার, বৌদ্ধপূর্ণিমায় অশ্বত্থ গাছের একটি বিষয় আছে। অথচ এসব গাছপালা কেটে আমাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।’

জানা গেছে, ২০২১ সালের ৬ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষ ৬ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি নেওয়ার কথা বলেছিল। তারা ৬ মাস টাকা দেওয়ার পর আর দেয়নি। বর্তমানে ৬ পরিবারে ২৮ জন সদস্য রয়েছে। তাদের ৫ একর ৫৪ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ৯৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে অবকাঠামো ও ঘরবাড়ির জন্য। অথচ এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৩ কোটি টাকা। বাকী ২ কোটি ৪ লাখ টাকা এখনো দেয়নি রাষ্ট্র।

সংবাদ সম্মেলন শেষে নৌপরিবহন উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা