ফয়সাল আহম্মেদ
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১০:৩১ এএম
চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। এর মধ্যে দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টি হলেও গরম কমার নাম নেই। চলমান এই তাপপ্রবাহে রাজধানীর গণপরিবহনে দেখা দিয়েছে এক বিপর্যয়কর চিত্র। তীব্র গরম আর অচল ফ্যানের কারণে বাসের ভেতরে তৈরি হয় অসহনীয় পরিবেশ। এতে হাঁসফাঁস অবস্থা চালক, হেলপার ও সাধারণ যাত্রীদের।
কয়েকদিন ধরেই রাজধানীর তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে রয়েছে। কোথাও কোথাও তা পৌঁছেছে ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত। এই প্রচণ্ড গরমে যাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরাও।
এদিকে রাজধানীর সড়কগুলোর আশপাশে সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় পরিবহন শ্রমিকসহ যাত্রীদের প্রতিনিয়ত পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। এ ছাড়া রাস্তার পাশে কোনো গাছপালা না থাকায় গরমে সাধারণ মানুষের তাপদাহ থেকে বাঁচার উপায় নেই।
রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, ফার্মগেট, উত্তরা, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকাজুড়ে বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
দেখা যায়, ফ্যান থাকলেও অধিকাংশ বাসেই তা নষ্ট। জানালাগুলোও ঠিকমতো খোলা যায় না, যার ফলে বাতাসও প্রবেশ করতে পারে না। বাসে ওঠার পরই ঘাম ঝরতে থাকে। যাত্রীদের কেউ কেউ আবার পানির খোঁজে ব্যাকুল হয়ে পড়ে।
সায়দাবাদ থেকে রাইদা বাসে উত্তরা যাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সিদ্দিকুর রহমান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাসে উঠেই মনে হলো ভাপ উঠছে। ফ্যান চলে না, জানালা দিয়ে বাতাসও আসে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হয়। গরমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে।’
তরিকুল ইসলাম নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘গরমে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কষ্টের। সিট তো মেলে না, তাতে সমস্যা ছিল না। যদি অন্তত একটু বাতাস পেতাম। গণপরিবহন ব্যবস্থাটা যেন কষ্টের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
হাসান রাব্বী রাজধানীর মিরপুর এলাকায় থাকেন। চাকরির পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। যাত্রীর অপেক্ষায় তীব্র রোদের মধ্যে রাজধানীর নতুন বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কথা হলে জানান, তীব্র গরমের মধ্যে মোটরসাইকেল চালাতে কষ্ট হয়। সব সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। রাস্তার আশপাশে তেমন কোনো গাছপালাও নেই যে সেখানে দাঁড়িয়ে একটু ঠান্ডা হবেন। তারপরও পেটের তাগিদে এই গরমের মধ্যে যুদ্ধ করে রাস্তায় চলছেন।
পরিবহন শ্রমিকদের অবস্থাও ভালো নয়। রাইদা পরিবহনের চালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘ইঞ্জিনের ওপরে বসে গাড়ি চালাই। গরমে মনে হয় শরীর জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু কাজ তো ছাড়তে পারি না। পেট তো আর গরম বুঝে না।’
একজন হেলপার সোহেল বলেন, সারাদিন গাড়ির ওপরে থাকতে হয়। পানি কিনে খাওয়ার সামর্থ্য হয় না সবসময়। রাস্তার পাশে ঠান্ডা পানির ব্যবস্থাও নেই। গরমে মাথা ঘুরে আসে।
পরিবহন বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই অব্যবস্থাপনা চলছে। তাপপ্রবাহের সময় এগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গণপরিবহনগুলো যাত্রীবান্ধব নয়। বাসের সিট ও ভেন্টিলেশনের অবস্থা করুণ। অধিকাংশ ফ্যান অচল। তাপপ্রবাহে এসব বাস যাত্রীদের জন্য মূর্ত দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের কাজের পরিবেশও অত্যন্ত অনুন্নত।
তিনি আরও বলেন, ‘শহরে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, নেই পর্যাপ্ত ছায়া বা যাত্রীছাউনি; যা কিছু আছে, তা-ও ব্যবহারের অনুপযোগী। এই পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
তীব্র গরমে যখন সবাই একটু আশ্রয় খোঁজেন, তখন রাস্তায় থাকা যাত্রী ও পরিবহনকর্মীরা দিনভর যুদ্ধ করছেন জীবিকার তাগিদে। গরমে নাকাল এই জনজীবন যেন অসহনীয় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।