হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৫ ১১:২৩ এএম
বেনারসি পল্লী
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থিত ‘বেনারসি পল্লী’ দেশজুড়ে বিখ্যাত। স্বাধীনতার পরপরই গড়ে ওঠা এই পল্লীতে দুই শতাধিক দোকান রয়েছে, যেখানে বিয়ের জন্য প্রসিদ্ধ বেনারসি শাড়ি ছাড়াও পাওয়া যায় তাঁত, জামদানি, টাঙ্গাইল ও কাতানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। এ ছাড়াও এখানে লেহেঙ্গা, বিদেশি শাড়ি, পাঞ্জাবি-পাজামা, থ্রিপিস ও নানান ধরনের ওড়না পাওয়া যায়। সাধারণত সারা বছরই এখানে বেচাকেনা চলে, বিশেষ করে ঈদ ও বিয়ের মৌসুমে জমজমাট হয়ে ওঠে বাজার। কিন্তু এবারের ঈদে বেনারসি পল্লীতে দেখা গেছে চরম মন্দা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দশ-পনেরো বছরের মধ্যে ঈদের সময় এত কম বিক্রি তারা দেখেননি।
রবিবার সরেজমিন বেনারসি পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানেই ক্রেতা নেই। মাত্র দুয়েকটি দোকানে দু-একজন ক্রেতার উপস্থিতি দেখা গেছে। দোকানগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গল্প-আড্ডায় সময় পার করছেন। ‘রেসা বেনারসি’ দোকানের এক কর্মকর্তা বলেন, এবার আমাদের বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। ঈদের বাজারে এর আগে কখনও এমন পরিস্থিতি হয়নি। রোজার শুরু থেকেই সাধারণত কিছু বিক্রি হতো, কিন্তু এবার একেবারেই হচ্ছে না। দেখতেই তো পাচ্ছেন, আমরা এত লোক বসে আছি, কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই।
গত বছর রোজার সময়ের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর খুব ভালো বিক্রি হয়েছিল। গত তিন মাসেও আমাদের বিক্রি মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু এবার রোজার শুরু থেকেই ব্যবসা একেবারেই মন্দা। আমরা ভেবেছিলাম, ভারতের ভিসা বন্ধ থাকায় এবার ভালো ব্যবসা হবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। শুক্র ও শনিবার কিছুটা বিক্রি হবে বলে আশা করেছিলাম, কিন্তু তা-ও হয়নি।
‘নীল আঁচল’ শোরুমেও একই চিত্র। সেখানেও কোনো ক্রেতা নেই। দোকানের ব্যবস্থাপক শাহাদাত হোসেন বলেন, সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর বিয়ের মৌসুমে আমাদের বিক্রি বেশি হয়। ঈদের সময় কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু এবার ঈদের বাজার শুরুই হয়নি। আশা করছি, আরও এক-দুই দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে।
‘সিল্ক মিউজিয়ামে’র বিক্রয়কর্মী আশিক হোসেন জানান, সারাদিনে তাদের দোকানে মাত্র একজন ক্রেতা এসেছেন। তিনি বলেন, আগে রোজার শুরু থেকেই ক্রেতাদের ভিড় থাকত। এবার ঈদের বাজারের শেষ দিকে এসেও বিক্রি নেই। প্রতিটি দোকানের অবস্থাই খুব খারাপ। তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেকেই উপহার দেওয়ার জন্য শাড়ি কিনতে আসছেন না। আগে অনেকেই লট ধরে শাড়ি কিনতেন, এবার সেই চিত্র নেই।
বেনারসি পল্লীর আরও ৩০ থেকে ৪০টি দোকানে কথা বলে জানা যায়, এবার রোজার মাসে বিক্রি একেবারেই কম। দোকানদাররা বলছেন, সাধারণত রোজার ৯-১০ দিন পর থেকে বেচাকেনা বাড়ে, কিন্তু এবার সেই চিত্রও দেখা যাচ্ছে না। তারা এ অবস্থার জন্য অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে দায়ী করছেন।
‘শাহীনা ফ্যাশন হাউজের’ স্বত্বাধিকারী গোলাপী আশরাফ বলেন, এবারের রোজায় প্রতিটি দোকানের অবস্থাই খুব খারাপ। যারা আসছেন, তাদের বাজেটও কম। সবাই কম দামের পণ্য খুঁজছেন। অনেকে ১০-১২টি শাড়ি দেখেও কিছু না কিনেই চলে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে, তাদের হাতে টাকা নেই। তিনি আরও বলেন, আগে অনেকেই উপহার দেওয়ার জন্য শাড়ি কিনতেন, কিন্তু এবার সেই চাহিদাও কমেছে।
‘স্বর্ণা জামদানি’র বিক্রেতা মো. সবুর বলেন, ‘আমাদের বনি-বাট্টা করাই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় মানুষের হাতে টাকা নেই। এটাই মূল কারণ।’
‘গুলশান শাড়িমল’র এক বিক্রয়কর্মী জানান, সব সময়ই রোজার প্রথম ১০ দিন ক্রেতা কম থাকে। কিন্তু এবার সেই কম ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দিনে দুজন ক্রেতাও আসছে না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাই এর প্রধান কারণ।
‘আদি ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউজের’ ব্যবস্থাপক সাব্বির বলেন, দিনে কিছু ক্রেতা এলেও সন্ধ্যার পর ক্রেতা আসেন না। ছিনতাইয়ের ভয়ে মানুষ বাইরে বের হতে চাইছেন না। গত বছর এ সময় ভালো বিক্রি হয়েছিল, কিন্তু এবারের অবস্থা খুবই খারাপ।
বেনারসি পল্লীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা আসেন। রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা মুনিম বিন মাহমুদ বলেন, আমি জামদানি শাড়ি কিনতে এসেছি। কিন্তু দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গত বছর ১০ হাজার টাকায় যে শাড়ি কিনেছিলাম, এবার সেটা ১৪ হাজার টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না।
বেনারসি পল্লীর উল্লেখযোগ্য দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে রেসা বেনারসি, রূপ মহিনী গ্যালারি, বেনারসি রূপ সিঙ্গার, ঢাকাই জামদানি কুটির, রূপসী বেনারসি, বেনারসি কুঠি, বেনারসি বিগ বাজার, বেনারসি অলংকার, শাহিনা ফ্যাশন, কলকাতা বড় বাজার, পরশমনি শাড়ি, আদি ইন্ডিয়ান স্লিক হাউজ, অনন্যা বেনারসি কুটির, হাজী হারুন বেনারসি হাউজ, জান্নাত বেনারসি হাউজ, মিরপুর বেনারসি কুঠি, ওয়েডিং শাড়ি, মাহমুদা শাড়ি হাউজ, আল-হামদ বেনারসি, লীলাবালি, রঙ্গোলী, তানহা শাড়িজ, শীতল শাড়ি সেন্টার, শাহ আলী বেনারসি কুঠি, স্টার প্লাস শাড়িজ, লাল বউ বেনারসি, তাওছিফ বেনারসি ফ্যাশন, নাজ বেনারসি, মাহবুব বেনারসি কুঠি, মিতু কাতান শাড়ি ঘর, লাভানিয়া বেনারসি শাড়িজ, কোলকাতা শাড়ি বাজার, বেনারসি বাজার, মল্লিকা বেনারসি শাড়ি ঘর, পালকী, পাবনা বেনারসি মিউজিয়াম, মা বেনারসি শাড়িজ, লামিয়া বেনারসি হাউজ, স্বর্ণা জামদানি, নীল আঁচল শাড়িজ ইত্যাদি।