ফয়সাল আহম্মেদ
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৫ ১০:১৮ এএম
প্রবা গ্রাফিক্স
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীতে চালু হওয়া ই-টিকেটিং পদ্ধতির কাউন্টার বাস সার্ভিস এক মাস না গড়াতেই বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির উদ্যোগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি চালু হয়েছিল এই গোলাপি রঙের বাস সার্ভিস। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালিক-শ্রমিক পক্ষের সদিচ্ছার অভাব, কিছু কিছু পরিবহন নেতার চক্রান্তের কারণে উদ্যোগটা বলতে গেলে ভেস্তে গেছে।
ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো, যাত্রী ভোগান্তি লাঘব, যানজট পরিস্থিতিরি উন্নতিÑ এমন সব উদ্দেশ্য সামনে রেখে চালু করা হয়েছিল কাউন্টার বাস সার্ভিস। নিয়ম করা হয়Ñ টিকিট কিনে বাসে উঠতে হবে যাত্রীদের। নির্দিষ্ট রঙের এসব বাসে টিকিট ছাড়া কেউ উঠতে পারবেন না, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাও করা যাবে না।
গাজীপুর হয়ে আব্দুল্লাহপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করা ২২ কোম্পানির ১০০টি বাস নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি কাউন্টার ও ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। শুরুতে কোম্পানিগুলো দুই থেকে তিন দিন নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করে যাত্রী পরিবহন করছিল। কিন্তু কয়েক দিন পার না হতেই পরিবহন শ্রমিকরা আপত্তি তোলেন। তারা কেবল কাউন্টার থেকে যাত্রী তোলার নিয়ম মানতে রাজি নন। এই দাবিতে তারা সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন। পরে কোম্পানিগুলো কাউন্টার ব্যবস্থায় বাস চালানো বন্ধ করে দেয়।
গত শনি ও রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীতে কোনো সড়কে গোলাপি রঙের সেই বাস সার্ভিস নেই। সেসঙ্গে উঠে গেছে টিকিট কাউন্টারের বুথগুলো। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাসগুলো আবার আগের মতো যত্রতত্র যাত্রী ওঠাচ্ছে, আর চালক-শ্রমিকরা ফের চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় ফিরে গেছেন। ফলে যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সড়কে বিশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে নতুন করে।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, নতুন টিকিট পদ্ধতিতে তাদের আয় কমে গেছে। এ সার্ভিসের কারণে তাদের বাস চলাচলের তেলের টাকাও উঠছে না। কেননা নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যাত্রীরা নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে ওঠেন। ফলে বাস স্টাফদের হাতে ভাড়া তোলার সুযোগ থাকছে না। প্রতি ট্রিপে কোম্পানিভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয় বাসচালক ও সহকারীর জন্য। অথচ আগে কাউন্টার ছাড়া গাড়ি চালালে দৈনিক তিন থেকে চার হাজার টাকা উপার্জন হতো তাদের। কিন্তু এখন দিনে এক হাজার টাকাও থাকছে না। এজন্য তারা কাউন্টারভিত্তিক গাড়ি চালাতে রাজি নন।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, রাজধানীতে অধিকাংশ বাস চলে চুক্তিভিত্তিক; যেখানে চালক ও শ্রমিকরা দৈনিক জমা ও তেলের খরচ পরিশোধের পর বাকি অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। এতে কোম্পানিভেদে বাস মালিকরা পান ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আর বাস স্টাফরা পান ৩ থেকে ৪ হাজার। তা ছাড়া পরিবহন শ্রমিকরা প্রতিদিন গাড়ি চালান না, এক দিন পর পর তাদের ট্রিপ থাকে। এ অবস্থায় তাদের খাবারের খরচ বাদ দিয়ে দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রিপে বড়জোর দুই হাজার টাকার মতো থাকে। এই সামান্য আয়ে তাদের সংসার চলে না।
কাউন্টার ভিত্তিক গাড়ি চালাতে রাজি নয় পরিবহন কোম্পানিগুলোও। কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাউন্টার ব্যবস্থায় বাসগুলো যত্রতত্র লোক ওঠানো বন্ধ করছে না। ফলে সব ভাড়া কাউন্টারে জমা পড়ছে না। এতে কোম্পানির মোট আয় কমে গেছে।
এ ছাড়া পরিবহন শ্রমিকদের কেউ কেউ বলছেন, ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি সামনে ভালো কথা বললেও আড়ালে এর বিরোধিতা করে আসছে। পতিত সরকারের কিছু নেতা আছেন যারা চান না রাজধানীতে বাস সার্ভিস শৃঙ্খলার আওতায় আসুক।
এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘শ্রমিক এবং পরিবহন কোম্পানির কিছু অসৎ লোকের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কাউন্টার সার্ভিস বাস। কারণ এই দুই শ্রেণির লোক নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নেওয়ার চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘সব পরিবহন শ্রমিককে ই-টিকেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ করেছিলাম, বাস নির্দিষ্ট স্থানে থামাতে সাইন দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে দেরি করছে। আর এর সুযোগটা নিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।’
পতিত সরকারের কিছু নেতা পরিবহন মালিকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন এই পরিবহন নেতা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘শুধু কাউন্টার বসালে তা টেকসই হবে না। রাজধানীর সব বাসকে একক কোম্পানির আওতায় এক ছাতার নিচে আনতে হবে। “বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি” হচ্ছে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানোর পূর্বশর্ত।’
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘অসৎ পরিবহন নেতাদের কারণে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আসছে না। কেননা, এসব নেতা জানেন, “বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি” শতভাগ সফল হলে তারা আর নেতা থাকতে পারবেন না।’
তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকার পরিবহন নেতাদের ম্যানেজ করতে সমর্থ হয়নি এবং ম্যানেজ করার সৎ উদ্দেশ্যও ছিল না তাদের। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আমাদের ভরসা ছিল দ্রুতগতিতে পরিবহন সেক্টরকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে সমর্থ হবে। বিগত সরকারের আমলের এনায়েত উল্যাহর মতো রাজনৈতিক পরিবহন নেতারা দৌড়ের ওপর আছেন। তাই প্রত্যাশা ছিল পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরবে। কিন্তু সেটাও আলোর মুখ দেখবে কি না সংশয় আছে।’
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর একমাত্র সমাধান “বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি” ও “বাস রুট রেশনালাইজেশন”। ঢাকার মধ্যে হাজার হাজার বাসের প্রয়োজন নেই, বাসের ট্রিপ সংখ্যা বাড়াতে হবে। যে বাস এখন তিনটি ট্রিপ দিচ্ছে, সেটি যদি ১০টি ট্রিপ দিতে পারে তাহলে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। এতে বাস মালিকের খরচ কমবে এবং যাত্রীরও সময় সাশ্রয় হবে।’