প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০০:৩৪ এএম
পৌষের শেষ দিনে সাকরাইন উৎসবে বাড়ির ছাদে ঘুড়ি উড়ান পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। মঙ্গলবার শাঁখারী বাজার এলাকায়। ছবি: ফোকাস বাংলা
নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকায় উদযাপিত হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব। প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষ দিন অর্থাৎ পৌষসংক্রান্তিতে পুরান ঢাকায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। গবেষকদের ধারণা, উৎসবটি শত বছরের পুরোনো। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনটির। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মাঠে সাকরাইন উৎসব পালিত হয় গতকাল। এতে ঘুড়ি উড়িয়ে ও পৌষ মেলায় অংশ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের আমেজ তৈরি হয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকা (ডুসাড) উৎসবটির আয়োজন করে।
গতকাল সকাল পেরিয়ে বেলা গড়ার সঙ্গে পুরান ঢাকার ভবনগুলোর ছাদ
থেকে বাহারি রঙ আর নানা আকারের ঘুড়ি ওড়ানো হয়। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি রাজধানীর
অন্য এলাকা থেকেও অনেকে যোগ দেয় এ সাকরাইন উৎসবে। মুহূর্তেই বাতাসে উড়তে থাকা রঙিন
ঘুড়ির দখলে চলে যায় গোটা পুরান ঢাকার আকাশ। সন্ধ্যার পর আতশবাজির ঝলকে মেতে ওঠে
হাজারো মানুষ। আতশবাজির পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়ির ছাদে বসানো হয় লেজার লাইট।
যদিও অন্যান্য বছর থেকে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। উৎসবের আমেজ
কম। বিগত বছরগুলোর মতো জাঁকজমক নেই। কমেছে ঘুড়ি-নাটাই-সুতার বেচাকেনাও।
সাকরাইন বা পিঠাপুলির দিন মূলত পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে পালিত
একটি লোকজ উৎসব। কিন্তু এ উৎসবের রঙ, রীতি ও পরম্পরা পুরান ঢাকাবাসীর জীবনে এক বিশেষ
স্থান দখল করে আছে। এদিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হচ্ছে ঘুড়ি কাটাকাটির খেলা। সকাল
থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ খেলা।
সাকরাইন উৎসবের দিন পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,
বাসাবাড়ির ছাদ সাজানো হয়েছে বাহারি রঙের আলোকসজ্জায়। ছাদের ওপর শিশুদের মেলা, আছেন
বড়রাও। তাদের সবার হাতে নাটাই ও ঘুড়ি। বাড়িতে বাড়িতে বানানো হয়েছে পিঠা। কিছু কিছু
বাড়ির ছাদে আয়োজন করা হয়েছে ডিজে পার্টির। ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ঘুড়ি কেটে গেলে চিৎকার
আর হাসাহাসি। বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়স্বজন মিলে সে এক অন্য রকম উল্লাস। এ যেন এক মেলবন্ধন।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলির দোকানগুলোতে ঘুড়ি পাওয়া গেলেও সবচেয়ে
বেশি ঘুড়ি বেচাকেনা হয় শাঁখারী বাজারে। দোকানগুলোতে সাজানো রয়েছে নানা রঙ, আকৃতি
ও নকশার ঘুড়ি-নাটাই-সুতা। ক্রেতারা আসছে, দেখছে। আর পছন্দ হলেই দামাদামি করে কিনছে।
কিন্তু দোকানিরা বলছেন, বিগত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কম হচ্ছে।
শাঁখারী বাজারের বিক্রেতারা জানান, চারবুয়া বা কাউটা, টানা চোখ,
গোল চোখ, মৌসুমী, লাভ, লায়লাসহ বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি এসেছে। পাঁচ টাকা থেকে ৫০ টাকার
মধ্যে পাওয়া যায় এ ঘুড়িগুলো। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সুতা ও নাটাই রয়েছে। আকৃতিভেদে নাটাইয়ের
দামেও রয়েছে ভিন্নতা। সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি
স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকার আয়োজনে ঘুড়ি উৎসবে অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পররাষ্ট্রবিষয়ক
উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন এবং এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান
ফুয়াদ।
ঘুড়ি উৎসব নিয়ে
এমন আয়োজনের প্রশংসা করে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘যুগের পরিক্রমায় এইসব উৎসব
আমরা হারিয়ে ফেলছি। সে রকম সময়ে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করে।’
ইশরাক হোসেন ঢাকার
পুরোনো সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের এরূপ প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি
ও ঐতিহ্য রক্ষায় তরুণ প্রজন্মের এরূপ প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে। এ দেশের হারিয়ে যাওয়া
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পুনরুত্থানে শিক্ষার্থীদের এইসব উদ্যোগে আমরা পাশে থাকব।’
ঘুড়ি উৎসব আয়োজন
সম্পর্কে সংগঠনটির সভাপতি রাহাতউল্লাহ তৌসিফ বলেন, ‘ডুসাডের পক্ষ থেকে দ্বিতীয়বার আমাদের
এই আয়োজন। ঢাকার যান্ত্রিক জীবনে এই উৎসব প্রতিটি মানুষকে উৎফুল্ল করে তুলবে বলে আমরা
আশাবাদী। ঢাকা শহরে যন্ত্র ও কালো ধোঁয়ার পরিবর্তে আভিজাত্য, রঙ ও প্রাণের ছোঁয়াকে
পুনরুজ্জীবিত করতে ডুসাড সর্বদা সচেষ্ট।’
সংগঠনের সাধারণ
সম্পাদক আলিফুল ইসলাম নিষাদ সাকরাইন সম্পর্কে বলেন, ‘প্রতিবছর ঘুড়ি কাটাকাটি, রঙ-বেরঙের
ফানুস আর জমকালো আতশবাজি ফোটানোর মাধ্যমে জমে ওঠে সাকরাইনের আমেজ। ঘুড়ি উৎসবের আমেজের
পাশাপাশি গ্রামীণ পৌষ মেলার আনন্দ শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্যে আমাদের
এই আয়োজন। আমাদের বিশ্বাসÑ এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকাবাসী তাদের ঐতিহ্য রোমন্থন
করতে পারে।’
ডুসাডের শিক্ষা
উপদেষ্টা এবং ঢাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের
সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষায় শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন প্রশংসনীয়। ঢাকার তরুণদের এই আয়োজনের
সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে আমি আনন্দিত।’
উল্লেখ্য, ডুসাড ঢাকা শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সংগঠনটি প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান ছাত্রদের মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপন করে একটি সমবায় পরিবার গড়ে তোলার পাশাপাশি সাকরাইন, ঢাকা সপ্তাহ, গ্রন্থাগার দিবসসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে শহরের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে ঢাকা শহরের চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে আসছে।