প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:০১ পিএম
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:১৪ পিএম
মনিরুল ইসলাম অপু এবং তার স্ত্রী আমেনা বেগম। ছবি : বাসস
ছোট একটি ঘর। এতে নেই কোনো জানালা। একটি দরজা রয়েছে, তাও ভাঙ্গা। ঘরে আলো-বাতাস ঢোকার কোনো জায়গা নেই। তাই দিনের বেলাতেও ঘরটিতে থাকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। ঘরটি কবে রং করা হয়েছে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। ঘরের মধ্যেই রান্না করে খেতে হয়। ঘরের সামনে জমে আছে ময়লা পানি। সেই পানিতে পা ভিজিয়ে প্রবেশ করতে হয় ঘরে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহিদ ঝালমুড়ি বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম অপুর ঘরের চিত্র এটি।
মনিরুল ইসলাম অপু ৫ আগস্ট রাতে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার গোলকপাল লেন এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এই বাসাতেই ৬ হাজার টাকায় ভাড়া থাকছেন অপুর পরিবার। তিনি শহিদ হওয়ার পর এখনও তার পরিবারের সদস্যরা সেখানেই থাকছেন। বাসাটি ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের (বংশাল থানার পেছনে) ৭ নং গলির গোলকপাল লেনে।
সরেজমিনে বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসায় একটি মাত্র ঘর। ঘরে নেই কোনো খাট, আলমিরা, এমন কি নেই কোনো আসবাবপত্র। আছে শুধু একটি মাদুর বিছানো। রুমের মধ্যে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। সেখানেই রাতে থাকেন শহিদ মনিরুল ইসলামের স্ত্রী আমেনা বেগম এবং বড় সন্তান রবিউল ইসলাম শাওন। তাদের রাতে থাকার জন্য নেই কোনো লেপ বা তোষক। এই শীতের মধ্যেও তাদের এই ভাবেই কাটছে রাত।
শহিদ মনিরুল ইসলাম অপুর বড় ছেলে শাওন বলেন, আসবাবপত্র, খাট ও আলমিরা কয়েকটা ছিল। কিন্তু আব্বা শহিদ হওয়ার পর তা বিক্রি করে ঘর ভাড়া দিয়েছি। এখনও ঘর ভাড়া বাকি। কোনো দিন এক বেলা, কোনো দিন দুই বেলা খেয়ে দিন চলছে আমাদের। শুনছি অনেক পরিবার অনেক সহযোগিতা পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের অবস্থা সব থেকে খারাপ। অথচ আমরা এখনও কিছু পাইলাম না।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ভারতে। এ খবর শোনার পর থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ উল্লাস শুরু করে। তবে সারাদেশে যখন চলছিল বিজয় উৎসব, তখনও বংশাল চৌরাস্তায় চলমান ছিল পুলিশ ও সাধারণ জনতার মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং গোলাগুলি। এর একপর্যায়ে গোলকপাল লেনের মুখে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঝালমুড়ি বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম অপু।
মনিরুল ইসলাম ৫ আগস্ট শহিদ হলেও তাকে ৬ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে অবশ্য ১৭ ডিসেম্বর ময়না তদন্তের জন্য লাশ উত্তোলন করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে ওই দিন রাতেই আবার লাশ দাফন করা হয়।
সে দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শহিদ মনিরুলের স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আমার স্বামী ভেবেছিলেন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর গোলা-গুলি হবে না কোথাও। কিন্তু সেই দিন গভীর রাত পর্যন্ত বংশাল চৌরাস্তায় গোলা-গুলি হলো। খবর শুনে ছুটে যাই লোহার গেটে। গিয়ে দেখি আমার স্বামী পড়ে আছে। অনেক রক্ত বের হচ্ছে। আমি আমার স্বামীকে পানি খাওয়াই। পরে আমার ছেলে ওর বাবার লাশ ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে আমেনা বেগম বলেন, আমার পরিবারের অবস্থা খুব খারাপ। কিভাবে চলবে আমার সংসার? বাসাভাড়া পাঁচ মাস বাকি, কিভাবে পরিশোধ করব? বাড়ির মালিক বাসা ছেড়ে দিতে বলেছেন। ছেলেডারে নিয়ে কোথায় যামু? ছেলেটা বাবা ও ভাইকে হারিয়ে পাগলের মত হয়ে গেছে। এখনও সরকার বা জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে কোনো সাহায্য দেয় নাই। শুধু বলে এই কাগজ লাগবে, সেই কাগজ লাগবে। শাওন সেই কাগজপত্র সংগ্রহ করতে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছে। এ কারণে সে কাজও করতে পারছে না। এখন সংসারডা কীভাবে চলে?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি জানান, আমার ও ছেলেটার নিরাপদ ভবিষ্যত চাই। শাওনের জন্য একটা চাকরি চাই। মহল্লার মানুষের কাছে শুনি সরকার বিভিন্ন শহিদ পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা করছে। আমরা তো কোন সহযোগিতা পাই নাই। সরকার অবস্থা বিবেচনা করে যেন আমাদের সহযোগিতা করে।
শহিদ মনিরুল ইসলাম অপুর শ্যালক মো. খোকন বলেন, এই পরিবারের শুধু দুলাভাই আয়-রোজগার করতো। এদের তো আর দেখার কেউ নেই। আমার আপা ও ভাগিনাটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আমি যেটুকু পারি সাহায্য সহযোগিতা করছি। আমি চাই সরকারের পক্ষ থেকে যেন এই অসহায় পরিবারটির জন্য যেন কিছু করা হয়।
সূত্র : বাসস