বিহঙ্গ
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:২০ এএম
একাশিয়া গাছের ডালে পুরুষ তুর্রা। গত ৫ নভেম্বর গুলশানের বিচারপতি সাহাবুদ্দিন পার্ক থেকে তোলা। লেখক
ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৭টা বেজে তেইশ মিনিট। অথচ চারদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা, যেন ভোর ৫টা বাজে। স্থান ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর। হোটেলের উল্টোপাশের টং দোকানে বসে আগুন পোহাচ্ছি, সঙ্গে গরম গরম চা। শীতের সকালে দেহ-মন চাঙ্গা করার যেন মহৌষধ! চা পান করতে করতে হঠাৎই টং দোকানের পেছনের গাছের ওপর চোখ গেল। অন্ধকারে দুটি বড় বড় পাখি বসে আছে। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম। দুটি স্ত্রী ময়ূর! রাতটা ওরা ওখানেই কাটিয়েছে। ভারতের পথেঘাটে অহরহ ওদের দেখা গেলেও এদেশে ওরা বিলুপ্ত। চা শেষ করতে না করতেই গাড়ি চলে এলো। দ্রুত ভরতপুর পক্ষী অভয়ারণ্যের উদ্দেশে রওনা হলাম।
অভয়ারণ্যের ভেতরে যখন ঢুকলাম তখন প্রায় সোয়া আটটা বাজে। অথচ কুয়াশার চাদর সরছেই না। কুয়াশার মধ্যে ঘণ্টা দেড়েক ঘুরে ৩৪ প্রজাতির পাখির ছবি তোলার পর আলোর দেখা পেলাম। এরপর আরও চার প্রজাতির পাখির ছবি তুলে যখন ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে এগোচ্ছি, ঠিক তখন একটি নাম না জানা গাছের মরা ডালের ওপর ছোট্ট একটি পাখিকে বসে থাকতে দেখলাম। কিন্তু দুটি ক্লিক করতেই সে উড়ে গিয়ে আরেকটি বড় ডালে বসল। আর তখনই ওর গলা-বুকের লাল রঙ চোখে পড়ল। তবে মাত্র দুটি ক্লিক করতেই ও ঘন জঙ্গলের দিকে হারিয়ে গেল। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। যদিও বাংলাদেশের পক্ষী তালিকায় ১৯৬৭ সালে পাখিটির নাম উঠেছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে প্রথমবার ওকে দেখা যায় ঢাকার কেরানীগঞ্জে। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা যায় ২০২১ সালে।
নাইকন ফ্যান ক্লাবের উদ্যোগে গত ৩১ অক্টোবর সুন্দরবনে পাখি-প্রাণীর ছবি তুলতে গেলাম। পরদিন কচিখালি গিয়ে নেটওয়ার্ক এলেই ফেসবুকে ব্রিটিশ পক্ষিবিদ গ্যারি অলপোর্টের পোস্ট দেখলাম। তিনি ঢাকার গুলাশনের বিচারপতি সাহাবুদ্দিন পার্কে টকটকে লালচে-কমলা গলা-বুকের ক্ষুদ্র পাখিটির সন্ধান পেয়েছেন। আগে এদেশে যতবার পাখিটিকে দেখা গেছে কখনোই গলা-বুকের লালচে-কমলা রঙ অর্থাৎ প্রজনন পালকে দেখা যায়নি। সম্ভবত সেগুলো ছিল স্ত্রী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি। কোনো পুরুষ পাখি ছিল না। তিন দিন পর সুন্দরবন থেকে ফিরে ৫ নভেম্বর দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ও ব্যাংকার তারিকুল রনিকে নিয়ে পাখিটির খোঁজে গুলশান গেলাম। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা ধরে খুঁজেও দেখা পেলাম না। হঠাৎ পার্কের লেকের পাড়ে আরেক পক্ষী আলোকচিত্রী মামুনুর রশিদ রানার সঙ্গে দেখা। রানাই লেকের দিকে হেলে পড়া একাশিয়া গাছের ডালে পাখিটিকে দেখালেন। দেশের মাটিতে বিরল একটি পাখির ছবি তুলতে পেরে মনটা ভরে উঠল।
সূত্র মতে সাহাবুদ্দিন পার্কে এ বছর স্ত্রী ও পুরুষ মিলিয়ে এই প্রজাতির মোট চারটি পাখি এসেছে। তবে ওখানে একই গোত্রভুক্ত আরেকটি ছোট্ট পরিযায়ী পাখি বহু বছর ধরেই নিয়মিতভাবে আসছে। কাজেই দুই প্রজাতির পাখির মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝগড়াঝাঁটির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিজেই সেদিন এক প্রজাতির পাখিকে দেখলাম লাল গলা-বুকের পাখিটিকে তাড়া করতে। আমি সেদিন গলা-বুকের প্রজাতিটির একটি স্ত্রী পাখিরও দেখা পেয়েছিলাম বলে মনে হলো, কিন্তু যে অ্যাঙ্গেলে সেটার ছবি তুলেছি তাতে তার পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হতে পারিনি। আসলে আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে এ দুটি পাখি একই প্রজাতিভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে দুটিকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
এতক্ষণ ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর ও ঢাকার গুলশানের সাহাবুদ্দিন পার্কে দেখা যে ছোট্ট পাখিটির গল্প বললাম সে এদেশের বিরল এবং অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি তুর্রা। নামটি পশ্চিমবঙ্গের। ইংরেজি নাম রেড-ব্রেস্টেড ফ্লাইক্যাচার। এদেশে ইংরেজি নামের অনুবাদে লালবুক চটক/চুটকি বলে ডাকা হচ্ছে। তবে তুর্রা নামটি বেশ! তাই আমি এই নামটিই ব্যবহার করলাম। মাসসিক্যাপিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula parva (ফিসেডুলা পারভা)। মূল আবাস পূর্ব ইউরোপ, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া। শীতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিযায়ী হয়।
তুর্রা দেহের দৈর্ঘ্য ১১ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। ওজন মাত্র ১১ থেকে ১২ গ্রাম। প্রজননকাল ছাড়া বাকি সময় পাখিটি দেখতে লালগলা বা তাইগা চটকের মতো। এ সময় পুরুষ, স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা বাদামি, তবে গলায় লালচে-কমলা রঙ থাকে না। তবে, প্রজননকালে স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একেবারেই আলাদা। ধূসর-বাদামি মাথাসহ এ সময় পুরুষের দেহের ওপরটা হয় ফ্যাকাশে বাদামি। চিবুক, গলা ও বুকের ওপরটা উজ্জ্বল লালচে-কমলা, তাইগার পুরুষের ক্ষেত্রে শুধু গলাটাই লাল। স্ত্রীর দেহের উপরিভাগ ফ্যাকাশে দারুচিনি, গলা সাদা, হালকা হলুদ বুক। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ওপরের চঞ্চু কালচে ও নিচেরটা হালকা হলুদ। পা, পায়ের পাতা ও চোখের মণি গাঢ় বাদামি।
এরা বন-বাগানের পাখি। খোলামেলা বাগান, পথঘাট, চাষের জমি, পুকুর-ডোবাসংলগ্ন ঝোপঝাড়ে থাকে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। বেশ চটপটে ও অস্থির। সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকে। মূল খাবার পোকামাকড়। তবে, পাকা ফলেও অরুচি নেই। হাবভাবে অনেকটাই তাইগা চটকের মতো। কিন্তু ডাকটি আলাদা। ‘টিক-টরররট্…টরররট্ওয়া’ শব্দে ডাকে।
মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী তুর্রা মূল আবাস এলাকায় মাটি থেকে ৩ থেকে ৪ মিটার উচ্চতায় গাছের গর্তে মস, ঘাস ও পাতা দিয়ে ছোট কাপ আকারের বাসা বানিয়ে তাতে সবুজাভ-ধূসরের ওপর গোলাপি-বাদামি ঘন ছিট-ছোপে ভরা ৪ থেকে ৭টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই তা দেয়। ১২ থেকে ১৩ দিনে ছানা ফোটে। স্ত্রী-পুরুষ পালাক্রমে ছানাদের খাওয়ায় ও লালন-পালন করে। ছানারা ১২ থেকে ১৩ দিনে উড়তে শিখলেও ২৭ থেকে ২৯ দিনের আগে স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারে না।
লেখক : পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ