শিশু অপহরণ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৯ এএম
রাজধানীর লালবাগের বাসায় লুটপাটের পর শুক্রবার সকালে আট মাসের শিশু আরিসা জান্নাত জাইফাকে কোলে নিয়ে যায় ডাকাতদল। রাতেই মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে র্যাব। উদ্ধারের পর এক র্যাব সদস্যের কোলে হাস্যোজ্জ্বল জাইফা। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর লালবাগের একটি বাসা থেকে গত শুক্রবার মালামাল লুটের সঙ্গে অপহৃত আট মাসের শিশু আরিসা জান্নাত জাইফাকে উদ্ধার করেছে র্যাব। শিশুটি এখন তার মায়ের কাছে আছে। র্যাব বলছে, মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে শিশুটিকে অপহরণ করা হয়েছিল। চার অপহরণকারীর ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং ঘটনার আগের দিন ওই বাসায় সাবলেট হিসেবে ওঠা ফাতেমা আক্তারকেও গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
র্যাবের কাছে ফাতেমা জানিয়েছে, ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য পরিকল্পিতভাবে জাইফাকে অপহরণ করা হয়। তবে র্যাব ও পুলিশের ভাষ্য, ‘শিশুটির মা-বাবার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য বিরোধ চলছিল। বাবা পৃথক থাকতেন। এর নেপথ্যে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কি নাÑসেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে র্যাব ও পুলিশের মূল উদ্দেশ্য ছিল, শিশুটিকে উদ্ধার করা। অপহরণের ১৬ ঘণ্টার মধ্যে সেটা করা গেছে। বাকি কোনো রহস্য থেকে থাকলে সেটা তদন্তে বের হয়ে আসবে। চেষ্টা চলছে, ঘটনায় সরাসরি জড়িত অপর তিনজনকে গ্রেপ্তারের।’
র্যাব জানায়, শিশুটির মা ফারজানা আক্তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। শিশুটির বাবা আবু জাফর চাকরি করেন একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না বেশ কয়েক মাস ধরে। গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে র্যাব-১০-এর একটি দল মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাসা থেকে ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করে। একই বাসা থেকে তখন জাইফাকেও উদ্ধার করা হয়। তার পর তাকে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
র্যাব ও পুলিশ সূত্র বলছে, ঘটনার পর ফারজানা আক্তারের দেওয়া তথ্যে অসম্পূর্ণতা, অস্পষ্টতা এবং অসংলগ্নতা রয়েছে। সন্তান অপহৃত হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় এ রকম ঘটতে পারে। আবার এটাও হতে পারে, ঘটনার পেছনের অন্য কোনো রহস্যকে গোপন করতে গিয়ে অনেক কথা লুকানোর চেষ্টা চলছে। ডাকাত বা অপহরণকারীরা টাকা ও স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি ফারজানার দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। মোবাইল ফোনগুলো তারা ব্যবহারও করে। মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার ও ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি আরও তিন ব্যক্তি জড়িত। তাদের গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
র্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফাতেমা তার নিজের ব্যাপারেও একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়ে র্যাব-পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কখনও সে তার নাম ফাতেমা, কখনও শাপলা আবার কখনও রাইসা বলে জানায়। প্রথমে সে জানিয়েছিল, তার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। শিশুর মা ফারজানাকে ফাতেমা বলেছিল, সে অবিবাহিত এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী। পড়ালেখার পাশাপাশি সে সচিবালয়ের পরিবহনপুলে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করে। পরে জানা যায়, সে একজন গৃহিণী। স্বামীর নাম সেলিম হোসেন। তারা রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাস করে। বাড়ি নওগাঁ নয়, বগুড়ায়।
ফাতেমা পরে জানায়, ২০১২ সালে বগুড়ার একটি স্কুল থেকে সে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে ঢাকার লালমাটিয়া থেকে এইচএসসি পাস করে। পরে একই কলেজে মার্কেটিং বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেনি। ২০২৩ সালে বিয়ে হয় তাদের। ৩-৪ মাস আগে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিং এলাকায় তার স্বামীর ফ্ল্যাটেই বসবাস শুরু করেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে গতকাল শনিবার র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনিম ফেরদৌস শিশুটির অপহরণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
গ্রেপ্তার ফাতেমা আক্তারকে শিশু অপহরণের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে মুনিম ফেরদৌস বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে অফিসে যাওয়ার পথে শিশুটির মায়ের সঙ্গে ফাতেমার পরিচয় হয়। পরিচয়ের সময় ফাতেমা নিজের প্রকৃত নাম-ঠিকানা লুকান। তিনি শিশুটির মায়ের কাছে নিজের নাম বলেন রাইসা, বাড়ি নওগাঁয়। নিজেকে অবিবাহিত হিসেবেও দাবি করেন।’
র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অফিসে যাতায়াতের পথে পরিচয়ের সূত্রে ফারজানা ও ফাতেমার সম্পর্ক অল্প সময়েই গভীর হয়ে ওঠে। এভাবে সপ্তাহখানেক চলে দেখাশোনা আর কথাবার্তা। ফারজানার কাছে এই সময়কালে ফাতেমা কেবল তার নাম-ঠিকানা মিথ্যা বলেননি, বলেছেন তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি সচিবালয়ের পরিবহনপুলে চাকরি করেন। বেতন নিয়মিত না হওয়ায় আর্থিক কষ্টে রয়েছেন। এ কারণে একটি সাবলেট খুঁজছেন। পরে কয়েক দিন তাদের দুজনের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথাও হয়। একপর্যায়ে ফাতেমাকে বাসার একটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে ভাড়া দেন ফারজানা। এরপর ফাতেমা ওই বাসায় গত বৃহস্পতিবার ওঠেন। ভাড়ার অগ্রিম হিসেবে দুই হাজার টাকাও দেন তিনি।
র্যাব আরও বলেছে, বাসায় ওঠার পর ফাতেমা শিশুটির মাকে বলেছিলেন, তার গ্রামের বাড়ি থেকে চাল নিয়ে আসবে এক চাচাতো ভাই। পরদিন সকালে চাচাতো ভাই পরিচয়ে বাসায় ঢোকেন সুমন, হাসান ও রায়হান। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাতেই ফাতেমা শিশুটির মায়ের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে দেন। সকালে ফাতেমা তিন সহযোগীকে নিয়ে শিশুটির মায়ের মুখের ভেতর কাপড় গুঁজে হাত-পা বেঁধে ফেলেন। এরপর বাসা থেকে নগদ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও পাঁচ থেকে ছয় ভরি স্বর্ণ ও দুটি মোবাইল লুট করে নিয়ে যান।
র্যাব কর্মকর্তা মুনিম ফেরদৌস বলেন, ‘পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, শিশুটিকে অপহরণের পর তারা আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ের বাসায় যান। সেখানকার একটি বাসায় শিশুটিকে রাখা হয়। তবে শিশু অপহরণের খবরটি দ্রুত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ফাতেমা মুক্তিপণের জন্য আর ফারজানাকে কোনো ফোন দেননি।’
মুনিম ফেরদৌস বলেন, ‘অপহরণের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে র্যাব। শিশুটির বাবাও র্যাবের নজরদারিতে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শিশুটিকে অপহরণের সময় তার মায়ের দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যান ফাতেমা ও তার সহযোগীরা। সেসব ফোনে অপর সহযোগীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। এর পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহায়তায় ফাতেমার অবস্থান শনাক্ত করে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
মুনিম ফেরদৌস বলেন, ফাতেমা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তার সঙ্গে এই ঘটনায় জড়িত অন্য তিনজনের নাম সুমন, হাসান ও রায়হান। তাদের এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। পরিকল্পনা মতে, এই ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে থেকে শিশুটির মা ফারজানাকে অনুসরণ করা হয়। পরিকল্পনায় সাজানো নাটকের অংশ হিসেবে ফাতেমা ওই বাসায় সাবলেট হিসেবে ঢোকেন।’