ছাত্র আন্দোলনে নিহত
ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:৪৮ পিএম
পরিবারের সঙ্গে সাংবাদিক মেহেদী হাসান। ফাইল ছবি
স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ দিনের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীতে চেয়ারম্যান-মেম্বার নিয়ে বৈঠকে বসতে হয় ছাত্র আন্দোলনে নিহত ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদক মেহেদী হাসানের স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপিকে। বৈঠকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে বলা হয়, দুই সন্তান নিয়ে গ্রামে থাকতে। ঢাকার বাসার সবকিছু নিয়ে গ্রামে যেতে চাপ দিলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য রাজি হননি তিনি। এ ছাড়াও বলা হয়, বিবাহিত দেবরকে বিয়ে করার।
পপি বলেন, আমাদের বিয়ের পর থেকেই চাপ দেওয়া হতো গ্রামে থাকতে। আমার শ্বশুর তার ছেলেকে বলতেনÑ হয় বউ গ্রামে রেখে যাও, না হয় আরেকটা বিয়ে কর। তখন আমার স্বামী গ্রামে যেতে মানা করত। সে তার মেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াতে চাইত। নিজের কাছে রাখতে চাইত। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সেই চাপটা আমাকে দিতে শুরু করেছে। একটা সময় আমাকে আমার দেবরকে বিয়ে করতে বলেন আমার শ্বশুর। আমার দেবর বিবাহিত তার একটা বাচ্চাও রয়েছে। আমরা কেউই এই প্রস্তাবে রাজি হইনি। ঢাকায় থেকে আমি নিজেই কিছু করতে চাই। বাচ্চাদের জন্য আমাদের কোনো সঞ্চয় নেই।
গত ১৮ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে দায়িত্বরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা টাইমসের রিপোর্টার মেহেদী হাসান। তিন বছরের প্রেমের পর ২০১৮ সালে বিয়ে করেন মেহেদী হাসান ও ফারহানা ইসলাম পপি। সেই সংসারে দুটি কন্যাও আছে। বড় মেয়ে মাইমুনা বিনতে নিশার বয়স এখন সাড়ে তিন বছর। ছোট মেয়ে মেহরাজ বিন আনিশার বয়স মাত্র আট মাস।
বড় মেয়ে নিশা এখনও বাবাকে খোঁজে। পপি বলেন, বড় মেয়েটা বাবার জন্য বায়না করে। ওকে বোঝাতে পারি না, ওর বাবা আর কখনও ফিরবে না। সে বলে, ‘ভাত খাব না, বাবাকে এনে দাও।’ রাতে বাবার সঙ্গে খেলবে বলে এখনও অপেক্ষা করে।
মেহেদী যেদিন মারা যান, সেদিন বিকাল চারটায় তার সঙ্গে শেষ কথা হয় পপির। জরুরি প্রয়োজন না হলে তাকে ফোন না করার জন্য বলেন। ফোনের ওই পাশে গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন পপি। মেহেদী বলেছিলেন, ‘রাতে বাড়ি ফিরব।’ এরপর তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাবা-মাসহ স্ত্রী সন্তানদের দেখাশুনা করতেন মেহেদী হাসান। তাকে হারিয়ে দুই পরিবারই এখন চোখে অন্ধকার দেখছে।
স্বামীকে হারানোর শোক ভোলার আগেই পারিবারিক জটিলতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন পপি। দুই সন্তানের ভরণপোষণের জন্য নেই পর্যাপ্ত অর্থ। এ দম্পতি কেরানীগঞ্জের একটি ভাড়া বাড়িতে মাসিক ৫ হাজার টাকায় থাকতেন। তবে চার মাস ধরে ভাড়া পরিশোধ না করায় বাড়িওয়ালা তাকে এ মাসের মধ্যে চলে যেতে বলেছেন। মেহেদী হাসানের স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি জানান, এখন তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে কেরানীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। পপির বাবা-মা তাদের বড় ছেলের ওপর নির্ভরশীল। বাবা তিন বছর ধরে প্যারালাইজড। মা গৃহিণী। ছোট ভাই অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তাই তিনি একটা কাজ খুঁজছেন। তিনি বলেন, আমার ভাই একটি বাসার ম্যানেজারের কাজ করেন। যতটুকু আয় হয় তা দিয়ে তার বউ, বাচ্চাসহ আমার অসুস্থ বাবাকে দেখতে হয়। সেখানে আমার জন্য কিছু করার মতো অবস্থা তাদের নেই।
পপি বলেন, আমি শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমার শ্বশুর আমাকে নিয়ে ফেসবুকে নানা ধরনের অপ্রীতিকর পোস্ট করেন। আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্যও আমাকে দায়ী করা হয়। স্বামী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন আমি ‘ভালো বউ ছিলাম’ সবার কাছে। কিন্তু টাকায় সম্পর্ক নষ্ট হয়। আমার স্বামীর অফিস থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা আমার শ্বশুরকে দেওয়া হয় বাকি ১৫ হাজার টাকা আমাকে দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৫০ হাজার টাকা নগদ ও ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেন। সেই পঞ্চাশ হাজার টাকার অর্ধেক আমি শ্বশুরকে দিয়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সেটা অস্বীকার করেন। আর জামায়াতে ইসলামী থেকে আমাকে ২ লাখ টাকা দিয়েছে। সেখান থেকে অর্ধেক টাকা দিতে বলেছিলেন শ্বশুর। কিন্তু আমি বলি, প্রমাণ ছাড়া টাকা দিব না। পরে জামায়াত ইসলামী থেকে বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী চার ভাগের এক অংশ পাবেন তিনি। তখন ৫০ হাজার টাকা আমি শ্বশুরকে দিয়েছি। এদিকে প্রেস ক্লাব থেকে এক লাখ টাকা আমার শ্বশুরকে দিলেও সেই টাকার ভাগ আমি নিইনি। এ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা পেলেও আমাকে সেসব দেওয়া হয়নি। সঞ্চয়পত্রের টাকা আমি ভাঙাতে চাই না, আমার মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য লাগবে। আমাদের কোনো সঞ্চয় নেই। জমিজমাও নেই। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাইনি। আমার শ্বশুর পেয়েছেন কি না, তাও জানি না।
পপি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শ্বশুরবাড়ি থেকে বলা হয়েছিল, আমার বাবার বাড়ি থেকে যা পেয়েছি তা রেখে স্বামী আমাকে যা দিয়েছেন, তা যেন তাদের দিয়ে দিই। আমি বললাম, আমার স্বামীটা মারা গেছে। আমার তো তালাক হয়নি। তারা চায় আমি গ্রামে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকি। আমি চাই চাকরি করতে। যদি কোনো কাজ করতে পারি তবে আমি আমার শ্বশুরকেও টাকা দিব। আমার অন্য কোনো লোভ নেই। আমার স্বামী শহীদ হয়েছেন, ওকে শুধু গুলিই করা হয়নি, বুট জুতা দিয়ে কেউ আঘাত করেছে সেই চিহ্নও ছিল ওর শরীরে। আমার দুইটা শিশু সন্তান না থাকলে আমিও স্বামীর সঙ্গে কবরে চলে যেতাম। সংসারে আমাদের টাকার অভাব ছিল কিন্তু সুখের কোনো অভাব ছিল না।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদী হাসানের বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার ওষুধের জন্য টাকা লাগে। টাকা থাকলে ওষুধ খাই, না-হলে খাই না। ওষুধ খেলে শরীর সুস্থ থাকে। আমি চারবার স্ট্রোক করেছি। স্ত্রী অসুস্থ আর দুই ছেলের মধ্যে একজন খোঁজ নেয় না। ছেলেটার জন্য আমার চোখের পানি এখনও শুকায়নি। ছেলের কিছু স্মৃতি আমার কাছে রাখতে চাই।
দেবরের সঙ্গে পুত্রবধূকে বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি এমন প্রস্তাব দেইনি, অন্যরা দিয়েছেন। আমার বড় ছেলে মেহেদী আমাকে দেখত। মেজো ছেলে একটা টাকাও দেয় না। সে বিয়ে করে গাজীপুরে থাকে বউ নিয়ে। ছোট ছেলেটা মাদ্রাসায় পড়ে। আমি মনে করি না ফেসবুকে খারাপ কিছু বলেছি পুত্রবধূকে নিয়ে। সত্য কথা বলেছি। আপনারা তদন্ত করে দেখতে পারেন।