প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ২১:৩৫ পিএম
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ২১:৩৮ পিএম
সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সব স্তরের অংশীজনের অভিমত নিয়েই সংস্কারের কাজটি করা হবে বলে জানিয়েছেন আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় পুরোনো আইন শুধু সংশোধন করে খুব একটা ভালো ফল মিলবে না বলে মনে করেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাই ক্লাউড সিস্টেম, ডেটা ম্যানেজমেন্ট, ডেটা ট্রান্সমিশন, ডেটা অপারেটিংয়ের মতো সিস্টেম ও প্লাটফর্মে দেশীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেছেন তারা। এদিকে সাইবার নিরাপত্তা আইনটিকে ‘নিবর্তনমূলক’ উল্লেখ করে সেটি বাদ নিয়ে নতুন করে জনবান্ধব আইন করার কথা বলছেন সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন: নিরাপত্তা ও বাক্স্বাধীনতার ভারসাম্য কেমন?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় এমন মত তুলে ধরেন বক্তারা। টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক (টিআরএনবি) এই গোলটেবিলের আয়োজন করে।
সভায় আইন বিশেষজ্ঞ, আইসিটি প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদরা নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলাদেশ সাইবার নিরাপত্তা আইন- ২০২৩-এ জরুরি সংশোধনের আহ্বান জানান। তারা বলেন, ‘অপপ্রচার ছড়ানো’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ এর মতো অস্পষ্ট শব্দগুলো সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এতে আইনটি নাগরিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
মূল প্রবন্ধে ফেসবুককে ‘সার্ভিলেন্স টুল অব ইউএসএ’ অভিহিত করে টিআরএনবির সাবেক সভাপতি রাশেদ মেহেদী বলেন, ‘ফেসবুক, গুগলকে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বলে মনে করার কিছু নেই। এটা যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভিলেন্স টুল। আমেরিকার জন্য নাগরিক নজরদারির অন্যতম অনুষজ্ঞ ফেসবুক ও গুগল। যে ডিভাইস ও ব্রাউজার ব্যবহার করি তাও আমেরিকার। তাই এটিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বলার সুযোগ নেই। আবার সব ধরনের বড় সিডিএন এখন এই দেশটিতেই। তাই বিশ্বজুড়েই চলছে ডেটা যুদ্ধ। তাই ক্লাউড, সার্ভিলেন্স সহ ডেটার ব্যবসায় শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানা থাকতে হবে। সাইবারের পরবর্তী ধাপ মেটাভার্স। অপরাধ কখনো স্পেসের ওপর ভিত্তি করে না। তারপরও ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০১৮ সালে ডিজিটাল আইন নামে ৩২ ও ৫৭ ধারা যুক্ত করে নষ্ট করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইনটিতে ৪৩ ধারাকে ৪২ ধারায় রূপান্তর করা হয়। জেল উঠিয়ে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এতে ই-লেনদেনে জালিয়াতি উৎসাহিত হতে পারে।’
সাইবার সুরক্ষা আইন হালনাগাদ করা হচ্ছে জানিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে তথ্যপ্রযুক্তি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘সুরক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বড় ইস্যু। আইনের ভাষায় নেতিবাচক কিছু আছে কি না, সেটা দেখতে হবে। আইন নিবর্তনমূলক হওয়া যাবে না। সেলফসেন্সরশিপ মানে এমন নয়, যেন যা বলার কথা তা আমরা বলছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা বাক-স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছি। একে অর্থবহ করতে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। আমার দপ্তর থেকে মাত্র তিন-চার জন ব্যক্তি দিয়ে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (এনসিএসএ) চলছে। অথচ একে আরো শক্তিশালী করা দরকার। একইসঙ্গে নাগরিকদের নিয়ে বেশি বেশি নাগরিক সংলাপ করতে চাই। সব পক্ষের মত নিয়েই এই আইন সংশোধন করা হবে।’
বিশেষ অতিথি বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, সাইবার সিকিউরিটি আইন নিয়ে দুটি পক্ষের ভিন্ন অভিমত রয়েছে। একটি পক্ষের ভাষ্য, অর্থনৈতিক উন্নতি ও মতপ্রকাশের জন্য প্রযুক্তিগত দিকে অবাধ পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। অপর দিকে যারা এর কারিগরি দিক নিয়ে কাজ করেন, তারা নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চান। উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ জরুরি।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা, বাক্স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে কেমন করে কাজ হয়েছে, সেসব দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে আমাদের উপযোগী করে একটি নীতিকৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে দণ্ডবিধির আইন দিয়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে প্রণয়নের উপযোগিতা নেই।’ তাঁর ভাষায়, ‘ডাঙার আইন জলে প্রয়োগ না করাই ভালো।’
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহেমদ সাবির বলেন, ‘স্পেস ভিত্তিক অপরাধের জন্য বিচার করাকে আমি অযৌক্তিক মনে করি। অপরাধকে অপরাধের গুরুত্ব ও প্রভাবের মাত্রা অনুযায়ীই বিচার হওয়া দরকার। আসলে নতুন মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণের সক্ষমতা আমাদের দরকার। রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আইন করে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। ক্রসর্ডার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের বৈশ্বিক জোটগুলোর সঙ্গে যুথবদ্ধতা বাড়াতে হবে। নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’
বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার হামিদ বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাত খুবই ঝুঁকিপ্রবণ। প্রতিদিন দেশের আর্থিক খাতে ৬৩০টি সাইবার আক্রমণ হয়। তাই সাইবার অপরাধ কীভাবে ঘটে তা নির্ধারণ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ঠিক করতে হবে। ডেটাসুরক্ষা আইন করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকরভাবে সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার তথা ছক বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি ম্যানেজড ছক গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে দেশে কোন তথ্য রাখা বাধ্য করতে হবে তা নির্ধারণ করা দরকার।’