প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:০৮ পিএম
প্রেসক্লাবে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস কাঞ্চন। প্রবা ফটো
বর্তমান সরকারের কাছে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। আমি আগের সব সরকারের কাছেই সড়ক নিরাপদ করার জন্য আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছি।
মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) প্রেসক্লাবে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের কাছেও সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের দাবি জানাই। যে আইনে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘রোড সেফটি ইউনিট’ গঠন করতে হবে। এতে করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষা জীবন থেকে নিজেদের জীবন এবং অন্যদের জীবন বাঁচানোর কৌশল রপ্ত করতে পারবে।’
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) মনে প্রাণে 'রোডক্রাশ' মুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চায়। এ লক্ষ্যে দেশের ভেতরে ও বিদেশে আমাদের ১২০টি শাখা বছরব্যাপী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। স্বেচ্ছাব্রতী হয়েই সকলে আন্তরিকতার সাথে কাজটি করছেন। নিজেদের সময়, অর্থ ও মেধা ব্যয় করে আমাদের সহযোদ্ধারা সড়ক ও যানবাহন ব্যাবহারকারীদের সচেতন করতে এই কাজগুলো করে থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায় রোডক্রাশের কারণগুলো বের করে সেগুলো নিরসনের জন্য অ্যাডভোকেসি করে থাকে। মূলত, রোডক্রাশ মুক্ত বাংলাদেশ এখন ১৬ কোটি জনগণের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এতদিন এ কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন সমূহ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা কিছুটা আশায় বুক বেধেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে শিক্ষার্থী আন্দোলনের ফলে তৎকালীন সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ নামে একটি আইন পাস করলেও আইনটি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি এবং আইনটিতে সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত। আমরা বারবার সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম আইনটির নামকরন ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ করা হোক। দুঃখের বিষয় দুষ্টচক্রের চাপে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা কথাটি রাখা হয়নি।’
ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য রোডক্রাশে মানুষের মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও অসুস্থতা কমানো এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি লাঘবের উদ্দেশ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী রোডক্রাশে নিহত ও আহতের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ সরকার ‘Global Plan for Second Decade of Action for Road Safety-2021-2030’ ঘোষণা করা হয়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য হাতে খুব বেশি সময় নেই। এখন থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।’
নিসচার চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় এবং আমাদেরও বিশ্বাস রোডক্রাশের আচরণগত ৫টি মূল ঝুঁকি যেমন অতিরিক্ত গতি, ষ্টার্ন্ডাড হেলমেন্ট, সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, শিশুদের জন্য নিরাপদ আসনের অনুপস্থিতি বিবেচনায় রেখে যথাযথ আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়িত হলে সড়ক নিরাপদ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরীক্ষিত ও সুফল পাওয়া সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ-বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী ও দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করতে পারলে দ্রুত দেশ থেকে রোডক্রাশ কমে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে সড়কে মানুষের জীবনের মৃত্যু ঝুঁকি যেন কমে আসে তার জন্য নতুন আইনী কাঠামো প্রণয়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে সড়ক, পথচারি তথ্য সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক ব্যবকারকারী রোডক্রাশের শিকার হচ্ছেন। ঝরে যাচ্ছে আজও প্রাণ। থমকে যাচ্ছে পরিবার। সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম অংশ হচ্ছে যানবাহনের পাশাপাশি পথচারি পারাপার ও তাদের নিরাপদে চলাচল। আমাদের বিদ্যমান আইন ও নীতিকাঠামোতে তীব্রভাবে বিষয়টি অনুপস্থিত।
এসময় নিরাপদ সড়ক চাই অক্টোবর মাসব্যাপী কিছু কমসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।
কর্মসূচির মধ্যে আছে- ফ্রি হেলমেট বিতরণ, সড়কে যানবাহনে চলাচলের জন্য করুণীর শীর্ষক সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে সড়ক ব্যবহারে সচেতন করতে ‘শিক্ষার্থী’ সমাবেশ, যারা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে চায় এমন সড়ক যোদ্ধাদের মাঝে সেফটি জ্যাকেট বিতরণ, মোটর শ্রমিকদের মাঝে সেফটি জ্যাকেট বিতরণ, রাস্তায় যানবাহন চলাচলে এবং পথচারি পারাপারে ‘স্পীড ব্রেকার’ ও ‘জেব্রা ক্রসিং’ এ রঙ করন, যানজট নিরসনে ট্রাফিক ক্যাম্পেইন, সড়ক নিরাপত্তা ইস্যুতে সংবাদ সম্মেলন, শিক্ষর্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরন প্রদান, সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ কর্মশালা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, অভিভাবক সমাবেশ, মা সমাবেশ, চালক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, গোলটেবিল বৈঠক, র্যালী ও সমাবেশ, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়, সড়কের গুরুত্বপূর্ন স্থানে জনসচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, অবৈধ রেল ক্রসিংয়ে সতর্কতামূলক সাইন বোর্ড স্থাপন।
কর্মসূচির মধ্যে আরও আছে- মহিয়সী নারী মরহুমা জাহানারা কাঞ্চনের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন, রোডক্রাশে আহত/নিহত পরিবারের মধ্যে সাধ্যমত সহায়তা প্রদান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়ার আয়োজন এবং আহতদের সংবর্ধনা প্রদান, যেখানে নগর পরিবহন সার্ভিস নেই সেখানে নগর পরিবহন চালুর দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্বারকলিপি প্রদান, মানববন্ধন, শহরের জনবহুল এলাকায় সড়ক সচেতনতামূলক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বয়সভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন ও সেরাদের পুরস্কার বিতরণ, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচি পালন, দুর্ঘটনায় আহতদের স্বেচ্ছায় রক্তদান, দুর্গাপূজার সময় জনবহুল মন্ডপে যাতায়াতের রাস্তায় ট্রাফিক ক্যাম্পেইন ও যানচলাচল স্বাভাবিক রাখা, ইমামদের নিয়ে সড়ক নিরাপত্তামূলক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, বিট পুলিশিং ও হাইওয়ে পুলিশের সাথে মত বিনিময়, যানবাহন মালিকদের সাথে মতবিনমিয়। উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য অবমুক্ত করণ, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের মূল্যবান বাণী এবং দেশের সড়ক বিশেষজ্ঞদের লেখা নিয়ে ‘নিরাপদ’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ, ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন উপলক্ষে সরকারী কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ এবং নিসচা কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে নিজস্ব কর্মসূচি পালন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।