শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৪ ১৫:২৫ পিএম
যাত্রাবাড়ী থানা ভবনের সামনে আগুনে পোড়া গাড়ির সারি। প্রবা ফটো
যাত্রাবাড়ী থানা ভবনের সামনে আগুনে পোড়া গাড়ির সারি। ভেতরে ঢোকার কলাপসিবল গেট ভাঙা। ভবনে ঢুকেই চোখে পড়ল মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া মামলার আলামত-নথিপত্র। এখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে। থানা থেকে লুটপাট করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রসহ নানা জিনিসপত্র। থানায় নেই কোনো পুলিশ সদস্য। এক দিন আগেও যে থানা ছিল কর্মব্যস্ত, গত সোমবার রাতে সেটা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। যে যা পেয়েছে নিয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছে, লুটকারীরা সবাই টোকাই ও রিকশাচালক। থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে ও বাইরে শতাধিক যানবাহন আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে কঙ্কালের মতো পড়ে আছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে এসব চিত্র দেখতে সেখানে শত শত মানুষ ভিড় জমায়।
মরদেহ নিয়ে গুজব
এদিকে থানা লাগোয়া বিটিসিএল কার্যালয়ের সামনে পড়ে আছে তিনটি মরদেহ। মরদেহগুলো ঘিরে জটলা পাকাচ্ছে উৎসুক মানুষজন। কেউ বলছে, এরা পুলিশ। কেউ বলছে বাংলাদেশি পুলিশ না, এরা অন্য কোনো দেশের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার লোক। কেউ কেউ বলছে, ‘মরে পড়ে আছে তাতে কী? খুব ভালো হয়েছে। এরাই তো যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলি করে পাখির মতো মানুষ মেরেছে।’ অতি উৎসাহী কেউ কেউ ঘৃণা ঝাড়ছে থুথু ছিটিয়ে। বিটিসিএল ভবনের দরজার ঠিক সামনেও এমন একটি মরদেহ ঘিরে মানুষের জটলা। চিৎ হয়ে থাকা মরদেহটির পরনে শুধু বেগুনি রঙের ওপর সাদা বল প্রিন্টের একটি শর্ট প্যান্ট। সেটির সঙ্গে গোঁজা রয়েছে একটি মিনি রিভলভার বেল্ট কেস। এক হাতের কনুইয়ের কাছে লাঠির আঘাতের চিহ্ন। সেখান থেকে রক্ত ঝরে মাটিতে পড়ে জমাট বেঁধে আছে। মাথায় গুলির আঘাতের মতো চিহ্ন। বুকের ডানপাশের মাংস যেন খুবলে তুলে ফেলা হয়েছে, চামড়া পোড়া। বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে টেনে ছিঁড়ে ফেলা স্যান্ডো গেঞ্জির একাংশ। বুকের ওপর একটি চাবির গোছা। দুই টাকার একটি নোট, এক টাকা ও দুই টাকার দুটি কয়েন। পিঠের দিক থেকে বের হওয়া রক্ত ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। মরদেহের চারপাশ জুড়ে বেশ কিছু বাঁশ ও কাঠের লাঠি। চারপাশে জিনিসপত্র পোড়ানো ছাই। এসব ছাই লেপ্টে আছে মরদেহের মুখ ও শরীরে। এখানেও একই গুঞ্জন। সবার চোখেমুখে ঘৃণা ও ক্ষোভ।
শনাক্ত করার পরও লাশ নিতে ভয় পাচ্ছেন স্বজনরা
তবে এই জটলার কাছাকাছি চারজন মানুষের অভিব্যক্তি একেবারেই আলাদা। যেটা দেখে সহজেই ভিন্ন কিছুর আভাস পাওয়া যায়। তাদের একজন এগিয়ে এসে কথা বললেন। তার আগে নিশ্চিত হয়ে নিলেন, সংবাদকর্মী কি না। নিশ্চিত হওয়ার পর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আকুতি ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘ওই যে লাশটা। ওইটা আমার ভাইয়ের। মানুষজন যেভাবে ঘিরে আছে আর ক্ষোভ দেখাচ্ছে, তাতে পরিচয় দিয়ে সেটি নিয়ে যেতে পারছি না। এটা নেওয়ার ব্যবস্থা কী?’
প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েই রাজ্যের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ভদ্রলোকের নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘মাথার দাগ, পায়ের নখ, পেট ও শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, ইনি আমার বড় ভাই রেজাউল করিম। সিনিয়র কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানায়। বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায়। গতকাল সকালে পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। সকালে থানার কাছে এসেই তাকে শনাক্ত করেছি। কিন্তু এখান থেকে নেওয়ার সাহস পাচ্ছি না। আমাদের সঙ্গে তার বড় ছেলে রাকিবও আছে।’
একটু পরে নিহত কনস্টেবলের সম্মান প্রথম বর্ষ পড়ুয়া ছেলে রাকিব এলেন। তিনি বাবার পুলিশের পরিচয়পত্র দেখালেন। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, এখন কী করতে চান তিনি। জবাবে রাকিব বললেন, ‘আমার বাবা আইনের লোক। কিন্তু তাকে উদ্ধারে কোনো আইনের লোক এলো না! অথচ গতকাল (সোমবার) সকাল থেকে বাবার মরদেহ এখানে পড়ে আছে। এটি আমরা নিয়ে যেতে চাই।’
৪০টির বেশি লাশ গিয়েছে ঢামেক হাসপাতালে
শুধু রেজাউলের নয়, আরও ছয়টি মরদেহ পড়ে আছে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ও আশপাশের এলাকায়। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানা গেট ও বিটিসিএল ভবনের সামনে তিনটি, যাত্রাবাড়ী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে আরও দুটি এবং ডান পাশে একটি মরদেহ পড়ে আছে। পুলিশ বক্স থেকে অদূরে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে কামাল টিম্বারের আরেকপাশে রাস্তার আইল্যান্ডে পড়ে আছেন আরও একজন। তার কপালে একটি চিকন কাঠের চ্যালা ঢুকানো। মাথা থেকে রক্ত ঝরে গড়িয়ে পড়েছে। গায়ে খয়েরি পোলো টিশার্ট, পরনে খাকি রঙের ফুলপ্যান্ট। তার বুকের ওপর একটি পুলিশ স্যু, ভেস্ট ও ডিএমপির ইউনিফর্ম। শেষ পর্যন্ত দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সব মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে নিয়ে যায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, হাজার হাজার জনতা থানা ঘেরাও করে হামলা করে। ওই সময় থানা থেকে ব্যাপক গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয় তিন শতাধিক মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকে নিহত হয়েছেন। সেখানে ৪-৫ জন পুলিশও মারা যায়। তাদের অনেকের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গত সোমবার বিকাল ৫টার দিকে থানা ঘেরাও করে পুলিশকে অবরুদ্ধ করে ফেলে আন্দোলনকারীরা। পুলিশের বড় একটি দল ফিল্মি স্টাইলে থানা থেকে বেরিয়ে নির্বিচারে গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়। তখন বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহত হয়েছে। তবে থানায় কয়েকজন পুলিশ আটকা পড়ে। তাদের গণপিটুনি দিয়ে সেখানেই মেরে ফেলা হয়েছে। ঢামেক সূত্র মতে, যাত্রাবাড়ী থেকে ৪০টির বেশি লাশ গিয়েছে ঢামেক হাসপাতালে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে থানার ফটকে ঢুকতেই দেখা যায় শত শত মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন কোলের শিশু নিয়ে, কেউবা স্ত্রী-স্বজন নিয়ে। কেউ কেউ ছবি তুলছেন কেউবা ভিডিও করছেন। থানার সামনে দুই পাশে থানা পুলিশের যানবাহন ছাড়াও রিকুইজিশনের অন্তত ৬৫ যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। অনেকে পুড়ে যাওয়া গাড়িগুলো থেকে যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পূর্ব পাশে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ভবনের সামনে থানার অন্তত ৩৫টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।
যেটুকু আছে চেষ্টা চলছে রক্ষা করার
উৎসুক জনতার ভিড় ঠেলে নিচ তলার সিঁড়ি দিয়ে থানার দোতলায় উঠতেই চোখ আটকে যায়। বেশ কয়েকজন মিলে চেষ্টা করছে একটি স্টিল আলমারি নিচে নামানোর। পাশেই কিশোর বয়সি কয়েকজন বস্তায় ভরে নামিয়ে নিচ্ছে কিছু। কয়েকজন মিলে চেষ্টা করছে আলমারিটি ভাঙার। পুরো সিঁড়ি জুড়ে পোড়া কাগজপত্র আর কাচ ভাঙা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দোতলায় উঠতেই সামনে ছিল যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শকের (অপারেশন) কক্ষ। তার কক্ষের ডান পাশে হাজতখানা ও থানার অস্ত্রাগার। এ ছাড়া দোতলায় বাম দিকে ছিল ডিউটি অফিসারের কক্ষ, পরিদর্শক (তদন্ত) ও থানার ওসির কক্ষসহ বেশ কয়েকটি কক্ষÑ যেগুলোতে এসআই এবং এএসআইরা বসে কাজ করতেন। এসবই এখন ধ্বংসস্তূপ।
পরিদর্শক অপারেশনের কক্ষে আগুন না লাগলেও কক্ষে দরজা, ফ্যান, চেয়ার-টেবিল, বৈদ্যুতিক সুইচ, এমনকি জানালার গ্রিলও ভেঙে নিয়ে গেছে লুটপাটকারীরা। অস্ত্রাগারে কয়েকটি রাবার ও টিয়ার শেল দেখা গেছে। হাজতখানায় তখনও ধোঁয়া দেখা গেছে। ওসির কক্ষসহ অন্যান্য কক্ষে তখনও আগুন জ্বলছে। সব রুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে থানার দোতলার করিডোরে। এ ছাড়া ভবনটির ভেতর বিভিন্ন দেয়ালে দেখা গেছে হামলা ভাঙচুরের চিহ্ন।
তৃতীয় তলায় থানার সেরেস্তা কক্ষও পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। পাশেই অন্য একটি কক্ষের টেবিল চেয়ারে আগুন জ্বলছে। থানা মেসে পুলিশ সদস্যদের থাকার জায়গায় কোনো আসবাবপত্র নেই। ফ্রিজ, তোষক-বালিশসহ নানা ধরনের জিনিসপুত্র লুট হয়ে গেছে রাতেই। পুরো ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত পোড়া আধপোড়া ব্যবহৃত জিনিসপত্র। ছয়তলা ভবনটির তৃতীয় তলার পর আর ওঠা সম্ভব হয়নি।
এদিকে রাতেই থানার নানা ধরনের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। সকাল থেকেই স্থানীয় রিকশাচালক ও ভাসমান টোকাইদের পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে নানা জিনিসপত্র এবং থানার জানালার গ্রিলসহ পুড়ে যাওয়া যানবাহনের যন্ত্রাংশ খুলে দিয়ে যেতে দেখা গেছে। বিভিন্নজন যখন থানার বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, তখন দুপুরে দিকে বেশ কিছু শিক্ষার্থী থানায় প্রবেশ করে। স্থানীয় ভাসমান টোকাই ও রিকশা ভ্যানচালকদের বের করে দিয়ে থানার সামনের গেট আটকে দেয়।
তাদেরই একজন সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্র তাহসান নাফিজ বলেন, ‘আমরা ১০-১২ জন শিক্ষার্থী এসেছি, যা ধ্বংস হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন যেটুক আছে, তা রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।’