ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৪ ১৮:৪৮ পিএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪ ১৮:৫৩ পিএম
ঢামেক হাসপাতালে মঙ্গলবার ১১ বছর বয়সি আরিফুল ইসলাম আলিফকে খাবার খাওয়াচ্ছে ছোট বোন আফসানা মীম। রামপুরা কলোনিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে সে। প্রবা ফটো
পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন বাংলাদেশ সমাচারের সংবাদকর্মী আমিনুল ইসলাম ঈমন। পুরোপুরি সুস্থ হতে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন তার পরিবার ও চিকিৎসকরা। ইমনের পা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, হয়তো আর হাঁটতে পারবেন না তিনি। পাঁচ সন্তানের জনক আমিনুল পরিবারের একাই রোজগার করেন। তিনি আর কাজে ফিরতে পারবেন কি না সন্দেহ।
আমিনুলের স্ত্রী সুমি আক্তার জানান, ছেলে-মেয়েরা সবাই ছোট। টাকা যা ছিল তা দিয়ে আপাতত চিকিৎসা হচ্ছে। তবে একটা অপারেশন করতে হবে, সেজন্য আরও টাকা খরচ হবে। ডাক্তার জানিয়েছেন, তিনি হয়তো আর হাঁটতে পারবেন না। গুলিতে তার শরীর থেকে যে মাংস ঝরেছে গেছে তা পূরণ হতে আরও এক বছর সময় লাগবে। সুমি বলেন, ‘ও কাজ করতে পারব না আর। ছেলেগো পড়াশুনা বাদ দিয়া কাজে লাগাব। আর তো কোনো উপায় নাই।’
বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন আমিনুল। তার হাতে বুলেটের দাগ। সেই রাতে কী ঘটেছিল, সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার শরীর ডাক্তাররা দেখে ভয় পাচ্ছেন। কোমরের নিচে গোপনাঙ্গের পাশ থেকে গুলি বের হয়ে গেছে। আল্লাহ রহমত বেঁচে আছি। এভাবে মানুষ মারে তারা।’
সেদিন কী ঘটেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুক্রবার রাতে অফিস শেষ করে ফেরার পথে চিন্তা করলাম, বাসা তো নদীর ওই পারে। মালিবাগ রেলগেটের মোড় থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার হয়ে কেরানীগঞ্জ চলে যাব। আমার পরনে প্রেসের পোশাকও ছিল। রেলগেটের মোড়ে আসতেই আমার গুলি লাগে। ওদিকে আরও রিকশাচালক ছিল, ওরাও পড়ে গেছে। আমিও নিচে পড়ে যাই। চোখ খুলতে না পারলেও শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি যখন যাই, মালিবাগের মোড়ে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। ডিবির সিভিল গাড়ি ছিল দাঁড়ানো। সে সময় সেখানে কেউ ছিল না, কিন্তু হঠাৎ গুলি এসে লাগে। এর মধ্যেই পুলিশ এসে বলাবলি করছে, উনি তো প্রেসের লোক। উনাকে মেরেছো কেন? তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পাঠাও। কথাগুলো আমি শুনছিলাম। আধা ঘণ্টার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স এলো। আমাকে টানাহেঁচড়া করে গাড়িতে তোলা হলো। তারপর ওখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। এদিকে রক্ত ঝরার কারণে শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। আমি বন্ধ চোখে ওদের বললাম আমাকে বাঁচান, আমার ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে আছে।
শুধু আমিনুল না, এক দিনের ঘটনায় কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে অনেকেই। যে কারণে অচল হয়ে পড়েছে পরিবারগুলোও। সেই সঙ্গে নিম্নবিত্তরা চিকিৎসা খরচ চালাতে করছে ধারদেনা। ঢাকা মেডিকেলের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৯ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন অটোরিকশার চালক সুজন। পাশেই বসে আছেন তার ভাই সুমন ও বোন লাকি আক্তার। লাকির তথ্যমতে, সুজনের বয়স আঠারো। তার কোমরে গুলি লেগেছে। তিনি আর রিকশা চালাতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও কষ্ট হতে পারে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। লাকি বলেন, ‘ডাক্তার একটা ইনজেকশন আনতে বলেছেন। সেটার দাম ১০ হাজার টাকা। এখন আবারও ধার করতে হবে। কোথায় টাকা পাব তাই ভাবছি।’
সুজনের ভাই সুমন বলেন, ‘৩০ হাজার টাকার মধ্যে ২০ হাজারই ধার করছি। তবুও ভাই তো আর আগের মতো হাঁটতে পারবে না, কোনো ভারী কাজও করতে পারবে না, রিকশাও চালাতে পারবে না। ভাই বেঁচে ফিরবে সেটাই ভাবি নাই। ধারদেনা কইরা হইলেও ভাইকে বাঁচাতে চাই।’ সুমন জানান, গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে কাজ শেষে অটোরিকশা বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন সুজন। এ সময় হঠাৎ গুলি এসে লাগে তার কোমরে। পরিচিতজনরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসে। খবর পেয়ে তারা হাসপাতালে আসেন।
খেলতে বের হয়েছিল ১১ বছর বয়সি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম আলিফ। এ সময় অতর্কিত পায়ে গুলি লাগে তার। বাবা কামরুল ইসলাম গাড়িচালক, মা আসমা বেগম বাসাবাড়িতে কাজ করেন। আলিফের চিকিৎসায় কম খরচ হলেও অর্থের জোগান দেওয়াও পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ফ্লোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা চলছে তার। আলিফের পাশেই বসে মুখে খাবার তুলে খাওয়াচ্ছিল চার বছরের ছোট বোন আফসানা মীম।
সেদিন কী ঘটেছিল জানতে চাইলে আলিফ জানায়, শুক্রবার খেলতে বের হইছিলাম। হঠাৎ আশপাশে কী যেন হইছে, বুঝি নাই। তার মধ্যে পায়ে একটা গুলি লাগছে। আমি চিৎকার করে কান্না করতেছিলাম।
আলিফের মা আসমা বগেম বলেন, ‘ওর পায়ের আঙুল আর তালুর মাঝে গুলি লাগছে। সে সময় কয়েকজন ছাত্র ওরে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে গেছে। খবর পেয়ে পরে এখানে আনছি। এখন পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা খরচ হইছে। পুরো টাকাই ধার নিয়ে চালাইছি। এই সময়ে ওর বাপের কোনো ইনকাম নাই। রাস্তায় গাড়িই তো চলে না। ডাক্তাররে বললাম, ছেলের হাঁটতে সমস্যা হইব কি না, তারা কিছু বলে না।’