আরিফুল ইসলাম আদীব
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ১৯:৪৯ পিএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪ ২১:২৭ পিএম
মিরপুরের কালশির অটোচালক সাদাত হোসেন। প্রবা ফটো
‘ঈদের দিন গরু কাটব, চারটা কাজ অলরেডি পাইছি, শখে কসাইয়ের কাজ করি, রিকশা তো সারা বছরই চালাই, দুই দিনের জন্য কয়েকজন মিলে গরু কাটি, এতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পাই।’ শনিবার (১৫ জুন) এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মিরপুরের কালশির অটোচালক সাদাত হোসেন।
সাদাত স্থায়ীভাবে অটোচালক। নিজের কেনা অটোরিকশা চালান। তবে শখের বশে ঈদের দিন কসাইয়ের কাজ করেন। ৮ থেকে ১০ বছর ধরে তিনি ঈদে কসাইয়ের কাজ করছেন। প্রথম দিকে ২ থেকে ৩ হাজার পেলেও এখন ভালো টাকা পান। এক দিন কাজ করে ৭ হাজার টাকাও পান। আসল কসাই থাকে একজন। যে মূলত কাজের অর্ডার নেন। তার সঙ্গে সাদাত সহকারী হিসেব কাজ করেন। একটি গরু পুরো বানাইতে একজন বা দুজন আসল কসাইয়ের সঙ্গে ৩ থেকে ৪ জন সহকারী কাজ করেন।
শুধু সাদাত নন, এ রকম আরও অনেকেই আছেন সারা বছর অন্য কাজ করেন। তবে কোরবানির ঈদ এলেই এক দিনের জন্য কসাই হয়ে যান।
সাদাতের মতো শফিকুল ইসলামও একজন পান-সিগারেট বিক্রেতা। ঢাকায় পরিবারসহ থাকেন। মিরপুরের পূরবী এলাকায় পান-সিগারেট বিক্রি করে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা লাভ করেন। তিনিও ঈদের দিন সহকারী কসাই হিসেবে কাজ করেন। এবারের কোরবানির ঈদে তিনি শিকদার ও সওদাগর কসাই নামে তাদের দুজনের সঙ্গে কাজ করবেন।
শফিকুল বলেন, ‘প্রতিবার কোরবানির ঈদে শিকদার, সওদাগর এ রকম ৩ থেকে ৪ জন কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলে রাখি। তাদের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করব। এক দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা কাজ করে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পাই। অনেকে মাংসও দেন।’
শফিকুল ও সাদাতের মতো ৪-৫টি গরুর কাজ না করলেও এক-দুটি গরুর কাজ করেন এমন অনেকেই আছেন। তেমনই একজন হোসেন নামের ফল বিক্রেতা। তিনি পরিচিতদের দুজনের কাজ করে দেবেন। বিনিময়ে ২ হাজার টাকা ও মাংস পাবেন।
ভ্রাম্যমাণ এ রকম ছোট কসাইদের নিয়ে আসল কসাইয়ের অনেকে অস্বস্তিতে আছেন। মিরপুরের রূপনগরে ২০ বছর ধরে কসাইয়ের কাজ করেন আরমান কসাই।
তিনি বলেন, ‘আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি একটা কোরবানির ঈদের জন্য। এক ঈদে ১০ থেকে ১২টি গরুর কাজ পাই। আমাদের রেট হাজারে ২০০ টাকা, কিন্তু ভ্রাম্যমাণ বা দুই দিনের কসাইদের জন্য আমাদের কাজ নষ্ট হয়। আমরা যে কাজ ভালোভাবে ২০০ টাকা রেটে করি, সেখানে তারা কাজ না জানার ফলে অল্প টাকায় ১০০ টাকা রেটে কাজ করেন। আর পাবলিকও কম টাকা পেয়ে ওদের কাজে নেয়। ওরা কাজ করতে গিয়ে চামড়া কেটে ফেলে, মাংস রয়ে যায় ফলে অনেক চামড়া নষ্ট হয় এবং আমাদের কাজও নষ্ট হয়। ’
আরমান কসাইয়ের মতো একই অভিযোগ কোরাইশী মাংস বিতানের। তিনি বলেন, ‘আমরা ঈদে ভ্রাম্যমাণ কসাইদের নিইনি, ওরা কাজ ভালো জানে না, ফলে আমাদের পরিচিত কাস্টমার নষ্ট হয়।’
তবে ব্যতিক্রম আছেন জীবন মিয়া নামে একজন। তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে কসাইয়ের কাজ করেন। জীবন মিয়া বলেন, ‘ঈদের দিন ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে এসে আমাদের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অনেকে অন্য পেশা থেকে দুই দিনের জন্য আমাদের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করেন।’
ঢাকায় কয়েক বছর ধরেই কসাইয়ের দাম বেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত কসাই হিসেবে হাজারে ১০০ থেকে ২০০ টাকা রেটে কাজ করেন। ভালো কসাই হলে কাজের অর্ডার বেশি পান, রেটও বেশি ধরেন। যেমন আরমান কসাই এবার হাজারে ২০০ টাকা রেট ধরেছেন। জীবন মিয়া ধরেছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ। এর মধ্যে আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকায় ২৫ লাখের বেশি পশু কোরবানি হবে।’
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, ঢাকায় প্রশিক্ষিত কসাইয়ের সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার ৬০০ জন। ফলে দেখা যাচ্ছে, ১১ হাজার কসাইয়ের পক্ষে ২৫ লাখ পশু কোরবানির সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে চাহিদা থাকায় অন্যান্য পেশা- যেমন রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নানা পেশার লোক দুই দিনের জন্য কসাইয়ের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অনেক সময় নিজেরাই চার-পাঁচজন গ্রুপ করে পুরো গরু কাটার কাজ করেন।
দেশের চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় জোগান আসে কোরবানির ঈদের পশু থেকে। কসাই দক্ষ না হলে চামড়া ছাড়ানোর সময়ে কেটে যায় এবং চামড়ার সঙ্গে মাংস রয়ে যায়। ফলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। কসাইয়ের কাজ যথাযথভাবে না জানার ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক চামড়া নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ হাইডস অ্যান্ড স্কিনস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দক্ষ কসাইয়ের অভাবে প্রতি বছর বিশ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়।