× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রগতি সরণির ধীরগতি বাড়াচ্ছে মানুষের দুর্গতি

ফয়সাল খান

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ১৫:৩৮ পিএম

পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, সড়ক ও ফুটপাথ দখল, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে রাজধানীর রামপুরা প্রগতি সরণির সড়কটি দিন দিন হয়ে উঠছে নগরবাসীর চূড়ান্ত ভোগান্তির কারণ। এর কোনো প্রতিকার নেই যেন। মঙ্গলবার তোলা। প্রবা ফটো

পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, সড়ক ও ফুটপাথ দখল, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে রাজধানীর রামপুরা প্রগতি সরণির সড়কটি দিন দিন হয়ে উঠছে নগরবাসীর চূড়ান্ত ভোগান্তির কারণ। এর কোনো প্রতিকার নেই যেন। মঙ্গলবার তোলা। প্রবা ফটো

রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মালিবাগের আশফাকুর রহমান। বাসা থেকে তার অফিসের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটারের চেয়ে একটু বেশি। নিজের মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন প্রগতি সরণি হয়ে বাসা থেকে অফিসে যাতায়াত করেন আশফাকুর। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বললেন, বাইকে ১৭ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে ৪০-৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা না। কিন্তু প্রগতি সরণির মালিবাগ থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত যানজটের কারণে এই রাস্তা পাড়ি দিতে অন্তত দেড় ঘণ্টা; এমনকি কোনো কোনো দিন দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। যানজটের কারণে কর্মদিবসগুলোতে স্বাভাবিক গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর উপায় থাকে না। ছুটির দিনেও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি নেই। 

আক্ষেপ করে আশফাকুর বলেন, ‘অফিস করি ৮ ঘণ্টা, আর অফিস-বাসায় যাতায়াতে এই রাস্তায় প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা কাটাতে হয়। এমন দীর্ঘ সময় যানজট ঠেলে শরীরে আর বলশক্তি থাকে না। পৈতৃক বাড়ি মালিবাগে হওয়ায় পরিবার নিয়ে অফিসের কাছে বাসা বদলের সুযোগও নেই। অনেকটা নিরুপায় হয়ে সপ্তাহে অন্তত ছয় দিন এই ধকল পোহাতে হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। দিন দিন অবস্থা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা কী এই রাস্তার খবর জানেন না?’

আশফাকুরের মতো এমন আক্ষেপ নিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষকে বাধ্য হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে রাজধানীর প্রগতি সরণি দিয়ে। নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে এই পথ চলতে গিয়েই দিশাহারা আশফাকুর; আর যাদের চলাচল করতে হয় পাবলিক বাসেÑ তাদের ভোগান্তির কথা বলে শেষ করার নয়। বাধ্য হয়ে কিংবা প্রয়োজনবশত যারা নিয়মিত চলাচল করেন এই সড়কে; তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যানবাহন ব্যক্তিগত হোক বা পাবলিক- এই পথে যারা যাতায়াত করেন যানজটে-ধীরগতিতে তাদের সবার জীবনই রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে! 

অথচ নগরবাসী যেন খুব সহজে এবং স্বস্তিতে ঢাকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত করতে পারেন সেজন্য আশির দশকে তৎকালীন সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্মাণ করা হয় এই প্রগতি সরণি। প্রশস্ত সড়কটি দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম লাইফটাইম হিসেবেও বিবেচিত। কিন্তু স্বস্তির সড়কটি দিনে দিনে হয়ে উঠেছে নগরবাসীর চূড়ান্ত ভোগান্তির কারণ। সকাল-বিকাল, দিন-রাত সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটিতে। ছুটির দিনগুলোতেও যানজট এই সড়কের নিত্যচিত্র। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে প্রগতি সরণি যানজটে স্থবির হয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনও কখনও যানজট কিছুটা কমলেও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে বছরজুড়েই চলতে হয় ধীরগতিতে। পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশুবাহী যানবাহন ও বাড়িফেরা মানুষের চাপ এবং সরকারি উন্নয়নকর্মের প্রয়োজনে রাস্তার একাংশে যান চলাচল বন্ধ থাকায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সড়কে ভোগান্তির মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়েছে। 

কিন্তু প্রগতি সরণি কেন এমন দুর্গতির কারণ হয়ে উঠল? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রতিদিনের বাংলাদেশ কথা বলেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে। তারা মনে করেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনাহীনতা, অদূরদর্শিতা ও অপরিপক্বতার ফলে প্রগতি সরণির এ দশা। নগরের পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, সড়ক ও ফুটপাথ দখল, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতার মতো অনিয়ম পরিস্থিতি আরও অসহনীয় করেছে। যে পরিকল্পনা নিয়ে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে প্রগতি সরণি ধীরগতির একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। 

সরেজমিন চিত্র 

গত এক সপ্তাহ ধরে প্রগতি সরণি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে এই রাস্তায় সবচেয়ে যানজটপ্রবণ অংশটি হচ্ছে মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে কুড়িল বিশ্বরোডের রাজউক ফ্লাইওভার পর্যন্ত। এর মধ্যে আবুল হোটেল থেকে রামপুরা বাজার, রামপুরা ব্রিজ থেকে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, মধ্যবাড্ডা থেকে লিংকরোড, উত্তর বাড্ডা থেকে শাহজাদপুর, নতুন বাজার, কোকাকোলা থেকে নদ্দা, বসুন্ধরা বাসস্টপ এলাকায় দিনভর যানজট নিয়মিত চিত্র। বেশিরভাগ সময় সিগন্যালের সামনে গাড়ির জট লেগে থাকে।

কর্মদিবসগুলোতে কখনও কখনও মালিবাগ থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত পুরো সড়কে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি মধ্যরাত অবধি এই সড়কে তীব্র যানজট দেখা যায়। এই সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, কর্মদিবসে এই রাস্তায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর উপায় থাকে না। 

যাত্রীরা জানান, মালিবাগ থেকে কুড়িল পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট সময় লাগার কথা। অথচ দুই ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে কোনো কোনো সময়। মূল সড়কের এই যানজট সংযোগ সড়কগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে গুলশান-বনানী-খিলক্ষেত, হাতিরঝিল, মগবাজার এবং পল্টনগামী সড়কেও বিপত্তি পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব ছোট ছোট গলি দুই পাশ থেকে প্রগতি সরণির সঙ্গে এসে যুক্ত হয়েছে যানজট ছড়াচ্ছে সেসব সড়কেও। এর প্রভাব পড়ছে এসব এলাকার স্থানীয় জীবনযাত্রায়।

প্রগতি সরণিতে চলাচল করেন কিংবা এই সড়কের দুই পাশের এলাকায় বসবাস করেন এমন একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যানজট দিন দিন বাড়তে থাকলেও কর্তৃপক্ষ তা নিরসনে তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। ইউলুপসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও পরিস্থিতির মোটেও উন্নতি হয়নি। বরং একের পর এক স্থাপনায় এই সড়কে চাপ আরও বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সুপরিকল্পিত কোনো উদ্যোগ আছে বলেও শোনা যায়নি। 

এই সড়কের নিয়মিত যাত্রী হাসিবুল হোসেন জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই পল্টন থেকে তাকে উত্তরা যেতে হয়। প্রগতি সরণির যানজটে লম্বা একটা সময় চলে যায়। রাত ১২টার পরও এই যানজট কমে না। এমনকি ঈদের দিনও এই রাস্তায় যানজট থাকে। এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। 

বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা সরকারের একজন যুগ্ম সচিব পদধারী কর্মকর্তা প্রগতি সরণির দুর্গতি নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘একটি আদর্শ শহরের সড়কের যে বৈশিষ্ট্য তার কোনোটাই প্রগতি সরণির নেই। দূরপাল্লার বাস, লরি, ট্রাক, লোকাল বাস, কার, রিকশা, ভ্যান, মোটারসাইকেল, সাইকেল; অর্থাৎ যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক সব ধরনের যানবাহন এই সড়কটিতে একই সময়ে একই সঙ্গে চলাচল করছে। এর মধ্যে আবার ছোটাছুটি করে মানুষজন রাস্তা পারাপার করছেন। সবদিক থেকে সড়কটির ওপর এত চাপ পড়ছে, যা সামলানোর সক্ষমতা এই সড়কের নেই।’

যানজটের নেপথ্যে 

বাড্ডা এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আলমাস উদ্দিনের মতে, প্রগতি সরণির যানজটের প্রধান কারণ রিকশা। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, কোনো সড়কে ধীরগতির যান চলাচল করলে সার্বিকভাবে সেই সড়কের গতি কমে যায়। তা ছাড়া পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ না থাকায় পথচারীরা যখন রাস্তা পার হন তখন গাড়ি থামিয়ে রাখতে হয়। 

প্রগতি সরণির যানজটের জন্য রিকশাকে দায়ী করা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। ঢাকা মহানগরীর অবৈধ যানবাহন বন্ধ, ফুটপাথ দখলমুক্ত ও অবৈধ পার্কিং বন্ধে গঠিত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৯ সালের ৬ জুলাই কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মালিবাগ পর্যন্ত সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা এক সপ্তাহও বহাল রাখা যায়নি। 

তবে যাত্রী ও চালকরা জানান, মূলত এই সড়কে বিভিন্ন রুটের অজস্র লোকাল বাস চলাচল করে। চালকরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে বাস চালায়, যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। বিভিন্ন রুটের বাস দিনের বেলাতেও প্রগতি সরণির বেশ কয়েকটি পয়েন্ট হয়ে ইউটার্ন নিয়ে থাকেÑ এর ফলে ওইসব পয়েন্টে অন্যান্য যানবাহন বেশ কিছু সময় ধরে আটকে থাকে। এর চাপ পড়ে পুরো সড়কের ওপর। 

যানজটের ভুক্তভোগীরা আরও জানান, প্রগতি সরণির দুই পাশে অপরিকল্পিতভাবে একাধিক পেট্রোল পাম্প এবং সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। এসব স্টেশনে তেল-গ্যাস নিতে আসা গাড়ির সিরিয়াল বেশিরভাগ সময় মূল সড়কের ওপরে উঠে থাকে। এতে যানবাহন এবং পথচারী উভয়কেই চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হয়। 

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রগতি সরণির মালিবাগ থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়কের এমন কোনো জায়গা বাদ নেই যেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে না। সড়কের দুই পাশেই অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিংমল, দোকানপাট, কাঁচাবাজার, বিশেষায়িত আবাসিক এলাকা সবই গড়ে উঠেছে প্রগতি সরণির দুই পাশে। তারপরেও রয়েছে দখলদারদের দৌরাত্ম্য। দুই পাশের ফুটপাথে অবৈধ দখল থাকায় মূল রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। 

প্রগতি সরণির কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কে একইসঙ্গে রিকশা, অটো রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, দূরপাল্লার বড় বাস, লক্করঝক্কড় লোকাল বাস, এসি বাস, ট্রাক, পিকআপ, লড়ি ও কাভার্ড ভ্যানসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। মূল সড়কের অনেক জায়গায় গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। কয়েকটি এলাকায় মূল সড়কের ওপরে বড় বাসও পার্কিং করে রাখা হয়। 

দুর্ভোগ বাড়বে আরও 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রগতি সরণির যানজট এবং ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। নতুন বাজারের পর থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক পর্যন্ত সড়কটি যানবাহনের চাপে দিন ও রাতের বেশিরভাগ সময় স্থবির হয়ে থাকছে। মাত্র দুই কিলোমিটারের মতো রাস্তা পাড়ি দিতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগছে। সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা না থাকায় এমন যানজটের কারণ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই যাত্রী বা চালকদের। এই দুর্ভোগকে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছেন অনেকে! 

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যমুনা ফিউচার পার্কের উল্টোপাশে প্রগতি সরণির ওপরে মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি) কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে সিমেন্টের গার্ডার দিয়ে জায়গা ঘেরাও করে রাখার ফলে যান চলাচলের জায়গা অনেকটা সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে এই অংশটি পাড়ি দিতে যানবাহনগুলোকে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এমআরটি লাইন ১-এর আওতায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের উদোগ নিয়েছে সরকার। মেট্রোরেলের এই রুটটি বিমানবন্দর থেকে শুরু করে থার্ড টার্মিনাল হয়ে যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যাবে। এসব এলাকায় হবে ১২টি স্টেশন। প্রায় ২০ কিলোমিটার এই রুটের ১২ কিলোমিটার অংশই হচ্ছে প্রগতি সরণিতে। রেললাইন মাটির নিচে দিয়ে গেলেও স্টেশন নির্মাণের সময় সড়কে প্রভাব আরও বেশি পড়বে। এতে সড়কে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। 

এই সড়কের নিয়মিত যাত্রী নাজমুল হাসান বলেন, এই দীর্ঘ পাতাল রেলপথের কাজের জন্য প্রগতি সরণিতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। এখনও সেভাবে কাজ শুরু হয়নি। এজন্য যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে অল্প একটু সড়ক বন্ধ করা হয়েছে। তাতেই অবস্থা খারাপ। পুরোদমে কাজ শুরু হলে কী হবে তা তো চিন্তাও করা যায় না! 

এখানেই শেষ নয়Ñ চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আসা যানবাহনের একটি অংশ যেন যাত্রাবাড়ী না গিয়ে বিকল্প পথে ঢাকায় প্রবেশ করতে পারে সেজন্য হাতিরঝিল-আমুলিয়া-ডেমরা চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে চায়না কমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এ সড়ক নির্মাণের চুক্তিও হয়েছে। এই এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে যাত্রাবাড়ী না ঘুরে এক ঘণ্টার রাস্তায় ১০ মিনিটে পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আসা যানবাহন সরাসরি রামপুরা হয়ে প্রগতি সরণিতে উঠতে পারবে। এর ফলে প্রগতি সরণিতে গাড়ির চাপ আরও বাড়বে। 

বিশেষজ্ঞরা যা বললেন

প্রাগতি সরণির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার বাণী শোনা গেল না নগর পরিকল্পবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের কাছে এই সড়কের সমস্যাগুলো জানতে চাইলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই সড়কের শৃঙ্খলা ঠিক নাই। একসঙ্গে সব ধরনের গাড়ি চলাচল করছে। অবৈধ দখল ও পার্কিংয়ে সড়ক সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। কম জায়গায় একসঙ্গে অনেক গাড়ি চলাচলের কারণে প্রতিদিনই যানজট লেগে যাচ্ছে।’

সমাধান কীÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক বড় প্রকল্পের দরকার হয় না। শৃঙ্খলা ফেরাতে সদিচ্ছার প্রয়োজন, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নেই বললেই চলে। সবার নজর অবকাঠামো নির্মাণে।’ 

হাতিরঝিল-আমুলিয়া-ডেমরা চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে অধ্যাপক আদিল বলেন, ‘প্রগতি সরণি বিদ্যমান গাড়ির চাপ সামাল দিতে পারছে না। এর ওপর নতুন নতুন গাড়ি যুক্ত হলে প্রগতি সরণি ও হাতিরঝিল এলাকায় আরও যানজট তৈরি হবে।’

প্রগতি সরণির অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছাড়া অন্য কেউ তাদের শাসনামলে ঢাকায় নতুন কোনো রাস্তা নির্মাণ করেননি। পাকিস্তান আমলে যেসব রাস্তা ছিল সেগুলো নিয়েই স্বপ্ন দেখেছেন সবাই। এরশাদ তার শাসনামলে নির্বাহী আদেশে প্রগতি সরণি, বেগম রোকেয়া সরণি, বিজয় সরণি, মুক্তি সরণি ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছেন। তিনি এগুলো না করলে ঢাকা এখন ব্লক ডাউন হয়ে থাকত।’

ড. সামছুল হক আরও বলেন, ‘এরশাদ করে দিয়ে গেছে আর আমরা যচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করছি। এই সড়কের কি পরিমাণ লোড আছে, এখানে ভূমির ব্যবহার কি হওয়া উচিতÑ এসব চিন্তা করা ছাড়াই ভবনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখানে কি পরিমাণ গাড়ি চলাচল করবে, কি পরিমাণ মানুষ বাস করবে তার কোনো হিসাব বা পরিকল্পনা কারও নেই। প্রগতি সরণির সমান্তরাল রামপুরার পেছন দিয়ে আরও সড়ক নির্মাণের কথা ছিল। সেগুলোও সময়মতো হয়নি। যার ফলে এই সড়কের ওপর যে লোড চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই লোড নিতে পারছে না। কুঁজো হয়ে যাচ্ছে, স্থবির হয়ে যাচ্ছে।’ 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এগুলো পরিকল্পনার অদূরদর্শিতা ও অপরিপক্বতার ফল। তারা চিন্তা করতে পারছে না ঢাকায় প্রতি বছর কত গাড়ি বাড়ছে, কত মানুষ বাড়ছে, রাস্তার ধারণক্ষমতা কেমন, জনঘনত্ব কত হওয়া উচিত- তারা এই বিজ্ঞানের ধারেকাছে নেই। যানজটের জন্য গাড়ি যতটুকু না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী যারা গাড়ির অনুমোদন দিচ্ছে, যারা বিল্ডিংয়ের অনুমোদন দিচ্ছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা