রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ১৫:৩৩ পিএম
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর অস্থায়ী হাটগুলোতে ঢাকার বাইরে থেকে ক্যাটল ট্রেনে আসছে পশু। বৃহস্পতিবার দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশনে। প্রবা ফটো
কোরবানির পশুতে ভরে উঠেছে রাজধানীর হাট। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরুর প্রথম দিন। তবে এদিনে ২১টি হাটের মধ্যে স্থায়ী দুটির অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও অস্থায়ী হাটগুলো তেমন একটা জমে উঠতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া বিকালের দিকে বজ্রসহ বৃষ্টি হওয়ার কারণে অনেকটা সময়জুড়ে হাটের স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে থাকে। অনেক হাটেই ক্রেতার উপস্থিতি ছিল কম। তাদের অনেকেই আবার কেবল ‘দরদাম’ করে বাজারের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কেনার আগে দামের একটা ‘আইডিয়া’ নিতে আসা এই ক্রেতারা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় বেপারিরা এবার কোরবানির পশুর দাম বেশি হাঁকছেন।
এ অবস্থায় ঈদের আরও তিন দিন বাকি থাকায় একটু যাচাই-বাছাই করে পছন্দের পশু কিনতে চাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে হাতে সময় থাকায় বেপারিরাও সহজে পশু ছাড়ছেন না। তাদের ধারণা, ঢাকায় গরু-ছাগল রাখার জায়গা না থাকায় ঈদের আগ মুহূর্তে বেশিরভাগ মানুষ কোরবানির পশু কিনে থাকে। আজ শুক্রবার পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হবে বলে মনে করছেন তারা।
গতকাল সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতা কম থাকায় বেপারিরা কিছুটা অলস সময় কাটাচ্ছেন। অনেককেই গরু পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। আবার ট্রাক, পিকআপ বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিরামহীনভাবে গরু-ছাগল ঢুকতে দেখা গেছে হাটগুলোতে। হাটের আয়োজক ও বেপারিরা আশ্বাস দিয়েছেন, এবার পর্যাপ্ত সংখ্যক পশু পাওয়া যাবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান গতকাল বলেছেন, চলতি বছর কোরবানির পশুর চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি আছে। এ অবস্থায় কেউ ছলচাতুরি করে দাম বাড়াতে গেলে উল্টো তাদের মাথায় হাত পড়বে।
রহমতগঞ্জ গরুর হাট
লালবাগের রহমতগঞ্জের হাটে গিয়ে দেখা যায় অনেকে গোল হয়ে বসে চা খাচ্ছেন। কেউ কেউ ক্লান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। হাটে উৎসুক শিশুদের ছোটাছুটি দেখা গেলেও ক্রেতাদের তেমন একটা ভিড় দেখা যায়নি।
গরু নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা বজলুর প্রামাণিককে। তিনি বলেন, আপাতত ২৬টি গরু এনেছি। দাম সাড়ে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। একেকটা গরু রাখা বাবদ দিতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা। এর বাইরে গরু আনা, গরু ও নিজের খাবার খরচ, রাখাল খরচ- সব মিলিয়ে লাখ টাকা বিক্রির আগেই চলে গেছে। হয়তো শুক্রবার থেকে বিক্রি শুরু হবে। ভালো লাভ হবে এই আশা নিয়েই এতদূর এসেছি।
আজ ক্রেতার ভিড় বাড়বে, সেই সঙ্গে ভালো দামে বিক্রি হবেÑ এমন আশায় আছেন মো. পাপ্পু। মুন্সীগঞ্জ থেকে পাঁচটা গরু নিয়ে এসেছেন তিনি। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত একটাও বিক্রি করতে পারেননি বা করেননি। তিনি বলেন, এখানে তো বিক্রিবাট্টা হয় ঈদের আগের তিন দিন। হয়তো শুক্রবার থেকে শুরু হবে। তবে আশা ছিল আজকে থেকেই হাট জমবে। কিন্তু হাটে ক্রেতা কম। যারা এসেছেন, তারাও দরদাম করে চলে যাচ্ছেন। বলছেন, কাল (শুক্রবার) এসে কিনবেন।
কয়েকজন বিক্রেতা বসে ছিলেন এক জায়গায় জড়ো হয়ে। তাদের একজন জানান, হাজারে একটা গরু বিক্রি হচ্ছে। বেপারি মো. আলমগীর বলেন, আগে অন্য হাটে বসছিলাম। ৬ বছর পর আবার বন্ধু, ভাইগো সাথে এ হাটে আসলাম। আমাদের কাছে এটা একটা আনন্দের বিষয়। একসঙ্গে ২০টা ট্রাক নিয়ে ফরিদপুর থেকে আসছি। বিক্রি শুরু হয় নাই, গল্প করে সময় পার করতেছি। তবে আসার খরচ যদি না ওঠে, কেমন করে চলবে। আমার কাছে যা গরু আছে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দাম ধরেছি। গরুর খাবারের দাম বাড়ছে, গরুর দাম তো বাড়বেই।
হাটে ঘুরে দেখা যায়, এখানকার বেশিরভাগ গরুই মাঝারি আকারের। বড় গরু খুব বেশি দেখা যায়নি।
কমলাপুর হাটের চিত্র
কমলাপুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, গরু পরিচর্যায় ব্যস্ত বেপারিরা। সিরাজগঞ্জ থেকে ৯টি মাঝারি সাইজের গরু নিয়ে এ হাটে এসেছেন হামিদুল ইসলাম। কালো রঙের একটি ষাঁড় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাম চেয়েছেন তিনি। মুগদার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম সেই গরুর দাম বলেছেন ৯০ হাজার টাকা। বেপারি জানান, গরুর খাবারসহ সবকিছুর দাম বেশি। তাই বেশি দামে গরু কিনতে হয়েছে। কিন্তু ক্রেতারা সেই আগের মতোই দাম বলছেন। এমন দামে গরু বিক্রি করলে পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।
১৯টি গরু নিয়ে হাটে আসা ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম দুটি বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি ১৭ গরু আগামী দুই দিনে বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি। আলাপকালে আমিনুল বলেন, আমার গরুগুলো সাইজে ছোট। কম বাজেটের মধ্যে সবাই গরু কিনতে চাচ্ছেন। তাই আমার এখানে ভিড় করছেন।
লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গা ও কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাটের ইজারা দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ইজারাদার প্রতিনিধি সাইফুল মাদবর জানান, টুকটাক কিছু বেচাকেনা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ৮টি গরু বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তেজগাঁও গরুর হাট
তেজগাঁও হাটে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতার সমাগম এখানে কিছুটা বেশি। তবে তারা আশানুরূপ দাম বলছেন না বলে দাবি করেন বিক্রেতা ওমর ফারুক। তিনি বলেন, তার বড় দুটি গরুর দাম ১০ লাখ টাকা পড়ে যায়। এখনও এই দামের ক্রেতা পাওয়া যায়নি। তবে পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাটে ঘুরতে থাকা ক্রেতা হাসিবুর রহমানের দাবি, গরুর দাম অনেক চড়া। তিনি বলেন, আরও হাটে ঘুরেছি। গরুর দাম বেশি। আমার বাজেট আছে ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভালো গরু পাচ্ছি না। শেষদিনে কী হয় দেখব, তারপর কিনব।
গাবতলী স্থায়ী গবাদিপশুর হাট
ঢাকার সবচেয়ে বড় এবং স্থায়ী গবাদিপশুর হাট গাবতলীতে দেখা যায়, হাটের ভেতরে পশুর জন্য হরেক রঙের ত্রিপলের ছাউনি বানানো হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য উঁচু ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। এ হাটের হাসিল শতকরা ৫ টাকা। গরম বিবেচনায় পশু ও ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্যান লাগানো ও পানির সার্বক্ষণিক সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও তাদের রাখালদের জন্য খাবার হোটেলের ব্যবস্থাও রয়েছে। গরু, ছাগল, উট, মহিষ, দুম্বা ও ভেড়ার জন্য হাজারের বেশি ছোট-বড় ছাউনি তৈরি করা হয়েছে।
গাবতলী পশুর হাটের সিনিয়র রাইটার দেওয়ান মো. ইকরাম হোসেন বলেন, এবার ১৪টি হাসিল ঘর তৈরি করা হয়েছে। চাপ বেশি হলে বাড়ানো হবে। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এক হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করা হয়েছে। চেকার নিযুক্ত করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে পশুর হাট জমে উঠতে শুরু করেছে। শুক্রবার পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে বলে তাদের আশা। মানিকগঞ্জের গরু ব্যবসায়ী মো. মানিক বলেন, আমার সবগুলো গরু মাঝারি সাইজের। দাম ১ লাখ থেকে সোয়া লাখ টাকার মধ্যে। এই দাম ও সাইজের গরুর চাহিদা সবসময় বেশি থাকে।
তবে হাটে এখনও ক্রেতা কম বলে জানান আরেক বিক্রেতা হোসেন আলী। ১৬টি বড় সাইজের দেশাল জাতের গরু নিয়ে হাটে এসেছেন তিনি। বললেন, আমার ১৬টি গরুর মধ্যে সর্বনিম্ন দাম রয়েছে সোয়া ২ লাখ, সর্বোচ্চ সাড়ে ২ লাখ টাকা। ক্রেতারা আসছেন কিন্তু কিনছেন না, দাম জেনে চলে যাচ্ছেন।
ডিএনসিসির অস্থায়ী হাট
ডিএনসিসির কোরবানি পশুর অস্থায়ী হাটগুলো হচ্ছেÑ ভাটারা সুতিভোলা খালসংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তরা দিয়াবাড়ী ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা, মিরপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বসিলার ৪০ ফুট রাস্তা-সংলগ্ন খালি জায়গা, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশের খালি জায়গা, খিলক্ষেত থানাধীন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের মস্তুল চেকপোস্টের পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গা, উত্তরার ভাটুলিয়া সাহেব আরী মাদ্রাসা-সংলগ্ন খালি জায়গা এবং গাবতলী স্থায়ী গবাদিপশুর হাট।
ডিএসসিসির অস্থায়ী হাট
ডিএসসিসির অস্থায়ী হাটগুলো হচ্ছেÑ উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গা, ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ-সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট-সংলগ্ন খালি জায়গা, মেরাদিয়া বাজার-সংলগ্ন খালি জায়গা, লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গা ও কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ-সংলগ্ন খালি জায়গা, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল-সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গা, রহমতগঞ্জ ক্লাব-সংলগ্ন খালি জায়গা, শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন খালি জায়গা এবং সারুলিয়া স্থায়ী কোরবানির পশুর হাট।
‘চাতুরি করে দাম বাড়ালে মাথায় হাত পড়বে’
চলতি বছর কোরবানির পশুর চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি আছে, এ অবস্থায় কেউ ছলচাতুরি করে গরুর দাম বাড়ালে তাদের মাথায় হাত পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান। গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ, সেখানে প্রস্তুত আছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি আছে।
তাহলে গরুর দাম এত বেশি কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাজারে কারসাজি করে দাম বাড়ালে বাজার নিয়ন্ত্রণে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দাম নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের না। এটি বাজারের ওপরই নির্ভর করে।