ফয়সাল খান
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৪ ১০:৪১ এএম
আপডেট : ১১ জুন ২০২৪ ১১:২৬ এএম
কমলাপুর পশুর হাট থেকে তোলা। ছবি : ফোকাস বাংলা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যেসব জায়গায় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মধ্যে মেরাদিয়া অন্যতম। কাগজে মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন খালি জায়গায় কোরবানি পশুর হাট বসানোর কথা বলা হলেও এ হাটের বেশিরভাগ পশু রাখা হয় বনশ্রী আবাসিক এলাকার অলিগলিতে। এ নিয়ে বিগত কয়েক বছর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ের ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠও রয়েছে। যদিও ডিএনসিসি কর্মকর্তারা ‘কৌশল’ করে হাটটির নাম দিয়েছেন ‘ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তৎসংলগ্ন খালি জায়গায় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট’। কিন্তু প্রতি বছরেই হাটটি বসে পলিটেকনিকের খেলার মাঠে। হাসিল ঘর থেকে শুরু করে হাটের সব কার্যক্রম এই মাঠকে ঘিরে। এবারও খেলার মাঠেই হাটের সব কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছেন ইজারাদার। প্রতি বছরই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ভেতরের সড়ক, ফুটপাথ ও অলিগলিতে এ হাটের কোরবানির পশু বেচাকেনা চলে।
শুধু এই দুটি হাটই নয়, রাজধানীতে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাটগুলোর বেশিরভাগই আবাসিক এলাকা, সড়ক, ফুটপাথ, খেলার মাঠ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসছে। এতে একদিকে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ডিএসসিসি দনিয়া কলেজ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাটের ইজারা দিয়েছে। ‘খালি জায়গা’ নামে ইজারা দেওয়া হলেও বরাবরই এই হাট দনিয়া কলেজ মাঠে চলে যায়। এবার এই কলেজ মাঠে কোরবানির পশু বেচাকেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইজারাদাররা। কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন ও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গার হাটের পশুও স্থানীয় একটি স্কুল মাঠ পর্যন্ত চলে যায়। লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গার হাটটি মূলত ওই ক্লাবের মাঠকে কেন্দ্র করে বসে। ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের আশপাশের খালি জায়গার হাটের বেশিরভাগ অংশই সড়কের ওপর। শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের হাটটি সড়কের দুই পাশে বসে। তবে চাপ বেশি হলে সড়কের ওপরও রাখা হয় পশু। ডিএনসিসির মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গার হাটটি আবাসিক এলাকার মধ্যে পড়েছে। বছিলা হাটের গরু কেনাবেচা হয় সড়কে।
ইজারা কার্যক্রমের শুরুতে আফতাবনগর আবাসিক এলাকায় কোরবানি পশুর অস্থায়ী হাট বসাতে বিজ্ঞপ্তি দেয় উভয় সিটি করপোরেশন। তবে উচ্চ আদালতের আদেশে এই এলাকা থেকে হাট প্রত্যাহার করেছে সংস্থা দুটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার মানুষের কোরবানির পশুর চাহিদা পূরণ করতে অস্থায়ী হাটের বিকল্প নেই। কিন্তু এসব হাট শহরের আশাপাশের খালি জায়গায় বসানো হলে ঈদের আগে যানজট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। আবাসিক এলাকা ও খেলার মাঠে পশুর হাট বসানোর কারণে এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর মেরাদিয়া বাজার নাম দিয়ে বনশ্রী আবাসিক এলাকায় হাট বাসানো হচ্ছে। ঈদ মানুষের আনন্দের হয়, আর এই এলাকার মানুষের কাছে এই ঈদ দুর্ভোগের কারণ হয়ে গেছে। ইজারাদার প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা কিছু বলতে পারি না।
হাসিবুল হাসান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, বাসা থেকে বের হলে গরুর বর্জ্যের দুর্গন্ধ খুব পীড়া দেয়। এই দিনগুলো দুর্বিষহ লাগে। আমাদের অনুরোধ যাতে আবাসিক এলাকার ভেতর গরু তোলা না হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনসিসির ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল মাঠে প্রতি বছরই কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসানো হয়। কিন্তু স্থানীয়দের সমালোচনার মুখে ২০২২ সালে এ জায়গায় হাট বসানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ডিএনসিসি। সে আলোকে ওই বছর প্রাথমিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে এ মাঠের নাম ছিল না। এরপর স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মাঠে হাট বসানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করে সংস্থাটি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই ওয়ার্ডের হাতিরঝিলের উত্তর-পশ্চিম পাশের বিশাল এলাকায় সরকারি বা সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন কোনো খেলার মাঠ নেই। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি খেলার মাঠ রয়েছে। এর মধ্যে টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে সবাই ঢুকতে পারে না। ফলে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের একমাত্র খেলার জায়গা ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এই খেলার মাঠ।
স্থানীয় বাসিন্দা আকলিমা খাতুন বলেন, কোরবানির ঈদের আগে-পরে মিলিয়ে মাঠটি অন্তত দেড় মাস বন্ধ থাকে। ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে হাট বসানোর কাজ শুরু হয়ে যায়। ঈদের পর আরও ২০-২২ দিন লাগে মাঠ ঠিকঠাক করতে। অনেক সময় হাট শেষে মাঠ যথাযথভাবে প্রস্তুতও করা হয় না। বাঁশের খুঁটির অংশসহ নানা উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। যে কারণে বাচ্চাদের খেলতে পাঠাই না।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ড. মাহে আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। সম্প্রতি তার কার্যালয়ে গেলে তিনি জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন। জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন জানান, আমি যতদূর জানি হাটটি বসানো হচ্ছে মাঠের আশপাশের খালি জায়গায়।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. সফিউল্লাহ বলেন, গরুর হাটের জন্য সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ মাঠ বন্ধ থাকবে। এরপর তো ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করতে পারবে।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা ঈদকে একটি উৎসব হিসেবে নিয়ে থাকি। এখানে কিছু সমস্যা হলেও সবাই আনন্দচিত্তে মেনে নেয়। তবে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিই।
পশু উঠলেও বেচাকেনা নেই
হাজারীবাগ, ঢাকা পলিটেকনিক খেলার মাঠ, মিরপুর ৬ নম্বর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মাঠের হাট প্রস্তুত করা হয়েছে। কোররবানির পশুও উঠেছে হাটে। দেশের সর্ববৃহৎ হাট গাবতলী ও সারুলিয়ার স্থায়ী হাট পশুতে ভরে উঠেছে। এ দুই হাটে বিক্রি বেড়েছে অনেকাংশে। আগেভাগে চলে আসা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সড়কের দুর্ভোগ এড়াতে তারা আগেভাগে পশু নিয়ে চলে এসেছেন।
গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, নানা ধরনের পশুতে ভরে উঠেছে রাজধানীর সর্ববৃহৎ এই গবাদিপশুর হাট। ক্রেতার আনাগোনাও বেড়েছে। নিয়মিত মাংসের চাহিদা পূরণের পশু বিক্রির পাশাপাশি কোরবানি উপলক্ষেও পশু বিক্রি শুরু হয়েছে এই হাটে।
গাবতলী হাটে পাকিস্তানি উট নিয়ে এসেছেন আমজাদ ব্যাপারী। প্রতিটি উটের দাম চাওয়া হচ্ছে ৭০ লাখ টাকা। দাম শুনে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতারা। তবে উট দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো মানুষ। কেউ কেউ উটের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউবা উটগুলোকে একটু ছুঁয়ে দেখছেন।
আমজাদ ব্যাপারী জানান, দেশের মানুষকে আরবের কোরবানির আনন্দ দিতেই উট নিয়ে এসেছেন তিনি। ক্রেতারা ২২ লাখ টাকা পর্যন্ত দরদাম করেছে। তিনি ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি করতে চাচ্ছেন। দাম অতিরিক্ত চাওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে আমজাদ বলেন, উটগুলো ভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়েছে দাম তো একটু বেশি হবেই।
হাজারীবাগের বাসিন্দা সাফায়েত হোসেন জানান, গাবতলী হাটে এসেছি। পশু দেখছি। প্রতি বছর আগেভাগ পশু কিনি। বাড়িতে পশু রাখায় জায়গা থাকায় ঝামেলা এড়াতে এটা করি। তাছাড়া পরিবারের সবাই মিলে আমরা পশুকে খাবার খাওয়াই। যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করা, তাই কিছুদিন পশুকে যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করে থাকি।
১৭ হাট চূড়ান্ত
রাজধানীবাসীর কোরবানি পশুর চাহিদা মেটাতে এবার ১৯টি স্থানে অস্থায়ী হাট বসাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এরই মধ্যে অস্থায়ী ১৭টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। আরও দুটি হাটের ইজারা প্রক্রিয়াধীন। স্থায়ী হাট গাবতলী ও সারুলিয়াসহ মোট ২১ জায়গা থেকে এবার কোরবানির পশু কিনতে পারবেন নগরবাসী।