প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৪ ২০:৩৩ পিএম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪ ০০:০৭ এএম
কানাডাপ্রবাসী পারভীন আক্তার।
‘আমার জীবনে শান্তি নষ্ট করে দিছে এই রেপিস্ট। ব্লাকমেইলার সে। তার নিজের ইচ্ছায় আমার হাতে ধরা দিয়েছে। তাই নিজ হাতে রেপিস্ট ব্লাকমেইলারকে মেরে শান্তি নিলাম।’ কথাগুলো একজন নারীর লেখা চিরকুটে ছিল। জাপানপ্রবাসী স্বামী আরিফুল ইসলামকে খুনের পর চিরকুট রেখে পালিয়ে যান কানাডাপ্রবাসী স্ত্রী পারভীন আক্তার। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের মাটি প্রপার্টিজ নামক ভবনের দোতলার স্টুডিও ফ্ল্যাট থেকে আরিফুলের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ফ্ল্যাটটি অনলাইনে ভাড়া নিয়েছিলেন পারভীন আক্তার। আরিফ ছাড়াও তার আরেক স্বামী আছে। সেই সংসারে সন্তানও রয়েছে। আরিফেরও জাপানে আরেক স্ত্রী আছে। এরপরও তারা কেন বিয়ে করলেন এবং আরিফ কেন খুন হলেন- এসব রহস্যের জট খুলছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রেমের সম্পর্ক থেকে নোটারি কাবিননামার মাধ্যমে ২০২১ সালে নরসিংদীতে বিয়ে করেন আরিফ ও পারভীন। আড়াই বছরের মাথায় ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয় আরিফকে। রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডটি পারভীন ঘটিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার পর খুনি দ্রুত পালিয়ে যাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে না।
গত শনিবার বসুন্ধরা আবাসিকের সেই বাড়িটির ২০৩ নম্বর কক্ষ থেকে আরিফের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী- আরিফের বুকে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে চুরি দিয়ে গলা কাটা হয়। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ভাটারা থানা সূত্রে জানা যায়, আরিফ ও পারভীন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে গত ১৭ মে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন। ওই দিন বিকাল ৪টা ৯ মিনিটের দিকে দুজন একসঙ্গে বাসায় প্রবেশ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে পরদিন ১৮ মে ভোর ৬টায় বাসা থেকে একা বেরিয়ে যান পারভীন। তবে সেদিন আরিফ ফ্ল্যাট থেকে বের হননি। এমনকি ১৮ মে থেকে ফ্ল্যাটটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ১ জুন অ্যাপার্টমেন্টের পরিচ্ছন্নতাকর্মী কক্ষ পরিষ্কারের জন্য দরজায় নক করে ভেতর থেকে সাড়াশব্দ পাননি। বিকল্প চাবি দিয়ে রুমের দরজা খুললে উৎকট পচা গন্ধ এবং কক্ষের বিছানায় আরিফকে পড়ে থাকতে দেখেন। তিনিই পুলিশকে খবর দেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ গলিত মরদেহের পাশে একটি চিরকুট, নোটারি করা বিয়ের কাবিননামা উদ্ধার করে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে- এই হত্যাকাণ্ডে পারভীন জড়িত। কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করতেই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া হয়। খুনের পর পরই পারভীন কানাডায় পালিয়ে গেছেন। এটি একটি পরিকল্পিত খুন। পারভীন একাই খুন করেছেন বলে অনেকটাই নিশ্চিত। তা ছাড়া পাশে থাকা চিরকুটও বলে দিচ্ছে পারভীন খুন করেছেন। তবে এ খুনের সঙ্গে আর কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরেকটি সূত্রে জানা যায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি-ব্লকের ২ নম্বর রোডের যে ভবনে আরিফ খুন হয়েছেন, সেটির মালিক মাটি প্রপার্টিজ নামের একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। ভবনটির ফ্লোরে ফ্লোরে স্টুডিও ফ্ল্যাট বানানো রয়েছে। সেগুলোতে দেশি-বিদেশি অনেকে অল্প দিনের জন্য অনলাইনে ভাড়া নিয়ে থাকেন।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী- আরিফের বাবার নাম শাজাহান শিকদার। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার কালিকুর পাড়ায়। পারভীন আক্তারের বিস্তারিত পরিচয় উল্লেখ নেই। রবিবার (২ জুন) পর্যন্ত তার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। পারভীনের পরিচয় এবং কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মাটি প্রপার্টিসে পারভীনের দেওয়া একটি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। ওই ফোন নম্বরের সিডিআর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ১৭ মে কানাডা থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামেন পারভীন। সেখান থেকে আরিফসহ একসঙ্গে বসুন্ধরা আবাসিকের ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। পরদিন ১৮ মে দুপুরে পারভীনের সর্বশেষ অবস্থান ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরেই পাওয়া গেছে। খুনের পর তিনি ঢাকা ছেড়ে কানাডায় পালিয়ে গেছেন।
ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আরিফ এক বছর ধরে জাপানে ব্যবসা করছিলেন। সেখানে থাকার সুবাদে নাচুকি নামের এক জাপানি মেয়েকে বিয়েও করেন তিনি। পরে ওই স্ত্রীর নাম রাখা হয় আয়েশা। আয়েশা নামের ওই জাপানি স্ত্রী কখনও বাংলাদেশে আসেননি। স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি পারভীনের সঙ্গে আরিফের প্রেম হয়। পারভীনেরও স্বামী ও সন্তান রয়েছে। তার স্বামীর নাম বাবু। তা সত্ত্বেও পারভীন নোটারির মাধ্যমে আরিফকে বিয়ে করেন।