মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৪ ২১:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৪ ২১:৫৮ পিএম
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. ঊর্মি বিনতে সালামের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন বাগান-মালিকরা। প্রবা ফটো
চা-শিল্পে চরম সংকট চলছে দাবি করে এ সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন চা-বাগানের মালিকরা। চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলার বাগান-মালিক ও কর্তৃপক্ষ চা-শিল্পের সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী বরাবর নানা দাবিদাওয়া-সংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৩ মে) মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. ঊর্মি বিনতে সালামের কাছে এ স্মারকলিপি প্রদান করেন চা-বাগানের মালিকরা।
স্মারকলিপিতে চা-বাগানের মালিকরা উল্লেখ করেছেন, চা-শিল্পের অতি সংকটময় সময় চলছে। যার কারণে আমরা প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছি। চা-শিল্পের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হিসেবে জাতির পিতার দিকনির্দেশনা ও অপরিসীম অবদানের কথা। বিশেষ করে, ২০২২ সালে চা-শিল্প শ্রমিক আন্দোলনের মুখে যে অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল তা থেকে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই চা-শিল্প সংকট থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। বর্তমানে চায়ের নিলামমূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় চা-শিল্পের ভিত নড়ে গেছে। কয়েক লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী চা-শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে নিলামমূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারছে না। চলমান পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং জরুরিভিত্তিতে এ সমস্যাবলির সমাধানকল্পে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
বাগান-মালিকরা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে চায়ের উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫০ টাকা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চা বোর্ড, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ে চায়ের নিলামমূল্য নিম্নতম ৩০০ টাকা নির্ধারণ করলে চা-শিল্প আপাতত রক্ষা পেতে পারে। নিম্নতম মূল্যের ওপরে চায়ের মান অনুযায়ী নিলামমূল্য নির্ধারিত হতে পারে। পঞ্চগড়ে উৎপাদিত চা আমাদের জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও দুঃখজনক হলেও ওখানে চা উৎপাদনের কোনো নিয়মনীতি না মেনে খুবই নিম্নমানের চা উৎপাদিত হচ্ছে। ফ্যাক্টরি থেকে কোনো ট্যাক্স-ভ্যাট পরিশোধ না করে অবৈধভাবে চা বিক্রি হচ্ছে। এই নিম্নমানের চা বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানসম্মত চায়ের নিলাম বাজারে যথাযথ মূল্য পাওয়া থেকে বাধার সৃষ্টি করছে। ছোট-বড় প্রায় সব বাগানই বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে হাইপোথেটিক লোন নিয়ে থাকে এবং চায়ের নিলামমূল্য সরাসরি কৃষি ব্যাংকে জমা হয়ে তা পরিশোধ করা হয়। এই ঋণ পরিশোধের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বর্তমানে ১৩ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় তা পরিশোধ করা বাগানগুলোর পক্ষে অসম্ভব। বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পরিশোধের সুদের হার ৯ শতাংশ রাখার জন্য এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমার ব্যাপারে শিথিলনীতি গ্রহণ, রুগণ ও উন্নয়নশীল চা-বাগানকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। চা বোর্ডের বাধ্যতামূলক ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারণ আবাদ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রেখে শূন্যস্থান পূরণ করার ওপর জোর দেওয়া। বর্তমানে বাগানগুলোর হাতে সম্প্রসারণ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত তহবিলও নেই। তাই এই সম্প্রসারণ কার্যক্রম কয়েক বছরের জন্য স্থগিত রেখে শূন্যস্থান পূর্ণ করে উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সদয় দিকনির্দেশনা প্রার্থনা করছি। বর্তমানে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্যাক্টরিতে সবুজ কাঁচা চা পাতা (যা পচনশীল) প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, চায়ের মান রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা চা ফ্যাক্টরিগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি করেন।
স্মারকলিপি প্রদানকালে বাগান-মালিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খাদিম চা-বাগান ও জঙ্গলবাড়ি চা-বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল রশিদ চৌধুরী, রেহানা চা-বাগানের মালিক প্রফেসর শফিকুল বারি, চাঁনভাগ চা-বাগান, আমীনাবাদ চা-বাগান, হাবিবনগর চা-বাগান, খান চা-বাগান, লালাখাল চা-বাগান, আফিফানগর চা-বাগানের পরিচালক তেহসিন চৌধুরী, ফুলবাড়ী চা-বাগান, নুরজাহান চা-বাগান, বুরজান চা-বাগান, ফুলতলা চা-বাগানের মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সবুর খান, মালিনিছড়া চা-বাগান, দলই চা-বাগান ও রাজনগর চা-বাগানের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আজম আলী, হাফিজ চা-বাগান ও আয়েশাবাগ চা-বাগানের পরিচালক এমএ জামান সোহেল, মাথিউরা চা-বাগান, মোমিনছড়া চা-বাগানের পরিচালক রুকন উদ্দিন খান, কালিকাবাড়ি চা-বাগানের পরিচালক মুফতি মোহাম্মদ হাসান, কালিটি চা-বাগানের পরিচালক এমএ মালিক হুমায়ুন, লোভাছড়া চা-বাগানের পরিচালক ইউসুফ জোসেফ ফারগুসন, আল্লাদাদ চা-বাগানের পরিচালক ইফজাল চৌধুরী, মেঘালয় চা-বাগানের পরিচালক এমএ ওয়াকিল খান এবং তারাপুর চা-বাগান ব্যবস্থাপক রিংকু চক্রবর্তী।