রফিকুল ইসলাম সান, বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা)
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৪ ১০:৫০ এএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৪ ১৭:৫১ পিএম
পাবনার বেড়া উপজেলার শেখপাড়ায় কাসুন্দি বানাতে ব্যস্ত নারীরা। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
কাঁচা-পাকা আম, মুড়ি কিংবা গরম ভাতের সঙ্গে একটু কাসুন্দি- আহ্, প্রাণ জুড়িয়ে গেল! মন ভরে গেল! প্রত্যেক রসনাবিলাসী বাঙালিই জানে এর স্বাদ। সুস্বাদু, মুখরোচক। যদিও কেবল দক্ষতা হলেই চলে না, কাসুন্দি যারা তৈরি করেন, তাদের পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। তারপরও থেমে নেই কাসুন্দি বানানো। শুধু তাই নয়, এই কাসুন্দিই কপাল খুলে দিয়েছে বেড়ার নারীদের। পাবনা জেলার বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা ও শেখপাড়া মহল্লার নারীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই কাসুন্দি উৎপাদন করে সচ্ছল হয়ে উঠেছেন। আর তাদের পথেই এখন হাঁটছেন পাশের আরও দুটি গ্রামের প্রায় ২০০ নারী।
কাসুন্দি হলো একরকম মৌসুমি মসলাজাতীয় খাবার। বৈশাখ ও জ্যেষ্ঠ মাসে এর চাহিদা বেশি থাকে; সে কারণে এই দুমাসকে কাসুন্দি মৌসুমও বলা হয়ে থাকে। কাসুন্দি মৌসুমে মৈত্রবাঁধা অথবা শেখপাড়া গ্রামে যাওয়ার সময় দূর থেকেই শোনা যায় ঢেঁকি পাড়ানোর শব্দ। আর গ্রামে গেলেই চোখে পড়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি- প্রায় সবখানেই চলছে কাসুন্দি তৈরির কর্মযজ্ঞ। কোনো বাড়িতে হয়তো ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা হচ্ছে রাই-সরিষাসহ বিভিন্ন রকমের মসলা। কোথাওবা সেসব মসলা ও রাই-সরিষার গুঁড়ো গরম পানিতে গুলিয়ে তৈরি হচ্ছে কাসুন্দি। আবার কোথাও রোদে শুকানো হচ্ছে কাসুন্দি তৈরির নানা উপকরণ। যেসব বাড়িতে কাসুন্দি তৈরি হয় সেগুলোয় ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত দেখা যায় পাইকারি ক্রেতাদের ভিড়। যাদের বেশিরভাগই নারী। যাদের বাড়িও আশপাশের গ্রামগুলোতে। পাইকারি দরে কলস অথবা ডেকচিভর্তি কাসুন্দি কিনে তারা বিক্রির জন্য বেরিয়ে পড়েন কাছে- দূরের গ্রামগুলোয়। দিনভর ফেরি করে সেই কাসুন্দি বিক্রি করেন তারা।
গঙ্গারাণীর কাসুন্দি বানানোর কৌশল
সরেজমিনে গ্রামের নারীদের কাছ থেকে জানা গেল, প্রায় দুই যুগ আগে মৈত্রবাঁধার গঙ্গারাণী এই এলাকায় কাসুন্দি বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর তিনি কাসুন্দি তৈরি করেন না। তবে বিভিন্নজনকে এখনও কাসুন্দি বানানোর কলাকৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেন তিনি।
গঙ্গারাণী জানালেন, কাসুন্দি তৈরির প্রধান উপকরণ রাই (সরিষা)। এতে আরও লাগে জিরা, হলুদ, শুকনো মরিচ, জাউন, সলুপ, ধনিয়া, তেজপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের মশলা। রাইসহ মসলাগুলো প্রথমে কড়া রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর সেগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে ঢেঁকিতে গুঁড়ো করে নিতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ফোটানো গরম পানির সঙ্গে প্রথমে রাইয়ের গুঁড়ো মেশাতে হয়। পরে তাতে লবণসহ গুঁড়ো করা মসলাগুলো পরিমাণমতো মিশিয়ে নিলেই তৈরি হয় সুস্বাদু কাসুন্দি।
পুরুষেরাও এগিয়ে আসছে এ ব্যবসায়
মৈত্রবাঁধা ও শেখপাড়া- এ দুই গ্রামের ১০-১৫টি বাড়িতে চলে কাসুন্দি তৈরির কাজ। পুরুষেরা বাড়ির নারীদের বাজার থেকে কাসুন্দি তৈরির উপকরণ কিনতে সাহায্য করে থাকেন। কাসুন্দি মৌসুমে এর তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন শতাধিক নারী। কাসুন্দি মৌসুমে সব বাদ দিয়ে প্রতিজনের আয় হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কাসুন্দি বিক্রির কাজে বেশ লাভ হয় দেখে এখন অনেক পুরুষও এতে অংশ নিচ্ছে।
কাসুন্দি তৈরির সঙ্গে জড়িত শেখপাড়া গ্রামের আনু খাতুন (৪০) ও আজমিরি খাতুন (২৭) আফসোস করে জানান, দুই মাস না হয়ে সারা বছর ধরেই যদি কাসুন্দি তৈরি করা যেত, তাহলে তারা বাড়িতে দালানও দিতে পারতেন। এখন অল্প সময়েই তাদের যা আয় হয়, তাতে বছরের বাকি মাসগুলো খুব ভালোভাবে কেটে যায় তাদের।
ফেরি করে বিভিন্ন গ্রামে কাসুন্দি বিক্রি করেন মৈত্রবাঁধা মহল্লার নূরি বেগম (৫৫)। তিনি বলেন, ‘আমাগরে গিরামের কাসুনের (কাসুন্দি) সুনাম দূরদূরান্তে ছড়ায়া গ্যাছে। এই কাসুন বেচার জন্নে একদিক সেই পাবনা, আরেক দিকে সেই শাহাজাদপুরের (সিরাজগঞ্জ) নানা জায়গায় যাই। সব বাদ দিয়্যা দৈনিক গড়ে ৩০০ টাকার মতো লাভ থাকে।’
নাগরিকদের অভিমত
মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিখা রায় বলেন, ‘কাসুন্দি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত নারীদের প্রত্যেকেই দরিদ্র। সারা বছর ধরে তারা কাসুন্দি মৌসুমের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। কারণ কাসুন্দি মৌসুমে তারা যা আয় করেন, তাতে তাদের অভাবের অনেকটাই দূর হয়।’
বেড়া উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘কাসুন্দি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত নারীদের পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে, স্বাবলম্বী হয়েছে অনেকেই। চেষ্টা করছি সরকারিভাবে তাদের সহযোগিতা করার। অন্যান্য বিষয়েও ভালো প্রশিক্ষণ পেলে তারা ভালো উদ্যোক্তাও হয়ে উঠতে পারেন।’