প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৪ ২১:৫৫ পিএম
ফাইল ছবি
খোলাবাজারে মার্কিন ডলার নিয়ে চলছে লুকোচুরি খেলা। অবস্থা বুঝে স্বল্প পরিমানে ডলার বাজারে ছাড়ছেন মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে রক্ষণশীল আচরণ করছে ব্যাংকও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই মাস ধরে ব্যাংক ডলারের মজুদ কমছে, তবে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হওয়ার কথা নয়। মূলত. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভুল নীতির কারণে সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ক্রলিং পেগ পদ্ধতির মাধমে ডলারের দর এক ধাক্কায় ৭ টাকা বাড়ার প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার ডলারের বাজার অস্থির হয়ে উঠে। ওইদিন প্রতি ডলারের দাম ১২৭ টাকা পর্যন্ত ওঠে। তবে, গতকাল রবিবার সপ্তাহের প্রথমি দিন দাম কিছুটা কমে এলেও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না। বাজারজুড়ে আতঙ্ক ও লুকোচুরি ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। নানা বাহানা ও নাটকীয় গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে যারা ডলার কিনতে পেরেছেন তাদের গুনতে হয়েছে ১২১ থেকে ১২২ টাকা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলারের দাম বাড়ার পর থেকে খোলা বাজারে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। এরপর থেকে মতিঝিল, পুরানা পল্টনের মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রবিবার (১২ মে) রাজধানীর মতিঝিল ও পুরানা পল্টনের মানি চেঞ্জার হাউসগুলো ঘুরে দেখা যায়, কিছু দোকান খুললেও তাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা আগে যাচাই করে দেখছেন প্রকৃত গ্রাহক নাকি প্রশাসনের লোক। এমন পরিস্থিতির মধ্যে যারা কিনতে রাজি হচ্ছেন তাদের একেকজনের কাছ থেকে একেকরকম দাম চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার খোলা বাজারের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে।
মতিঝিলের এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে জানা যায়, ডলারের দর ১১৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা পর্যন্ত দর উঠেছে। যা আগের দিনের চেয়ে অনেকটা কম। তবে সরবরাহ সংকট ছিল আগের মতোই।
একেক দোকানে একেক দাম হওয়ার কারণে জিজ্ঞেস করা হলে পুরানা পল্টনের একটি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে জানানো হয়, আমরা আগের দিনের নির্ধারণ করা দাম ১১৯ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করছি। তবে অন্য একটি হাউসে দেখা যায় ১১৯ টাকা ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাদের কিছুটা বেশি দামে কেনা-বেচা করতে হচ্ছে। তবে গোয়েন্দা সদস্যদের ভয়ে অনেকে ডলার গায়েব করে দিয়েছে। আবার অনেকে বেশি দামের আশায় মজুদ করে বসে আছে।
এর আগে গত ৮ মে ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর হঠাৎ করে খোলা বাজারে ১১৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। এরপর গত সপ্তাহের শেষের দিকে আবার কমে আসে।
এতদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে আমদানি ও রপ্তানি থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকের কাছে কত দরে ডলার কেনা-বেচা করা হবে, তা ঠিক করত বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু হওয়ার পর ডলারের দামের মধ্য দর নির্ধারণ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর থেকে কিছুটা বেশি বা কম দরে কেনা-বেচা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ক্রলিং পেগের মধ্য দর ১১৭ টাকা।
এদিকে বর্ধিত চাহিদার মধ্যেই গত মার্চে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কমেছে। তাই কিছুটা স্বস্তিতে থাকা ডলার বাজার উত্তপ্ত হওয়ার আভাস ছিল আগে থেকেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে ব্যাংকগুলোর কাছে ছিল ৫৪৩ কোটি ডলার, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১০ কোটি ডলার কম। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৫৫৩ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে এ অঙ্ক ছিল ৫৫৬ কোটি ডলার। আর ২০২৩ সালের মার্চে ছিল ৫৩৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ ব্যাংকের ডলার মজুদ কিছুটা বাড়লেও রিজার্ভের জোগান দিতে গিয়ে তা আবার কমে যাচ্ছে। এই হিসাবে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোতে বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত হ্রাসের কারণে বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়ই একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এই ঘাটতি দেশের আমদানি সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় মন্থর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।