অফশোর ব্যাংকিং নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৪ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪ ১০:৫৮ এএম
দেশে চলমান বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নিরসনের লক্ষ্য সামনে রেখে জাতীয় সংসদে অফশোর ব্যাংকিং বিল পাস হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, এই বিলের ফলে আইনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ বেড়েছে। দেশের অর্থনীতির জন্য বাস্তবে এই বিল কতটা স্বস্তিদায়ক হবে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকারদের রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তবে অর্থ পাচারের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়টি এই আইন নিয়ে আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবদরা বলছেন, দেশে অফশোর ব্যাংকিং আগে থেকেই চালু রয়েছে। বর্তমানে এটির আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন চাইলেই যেকোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে না। আইনের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির যেসব সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, তার স্থায়িত্ব বেড়েছে ও আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হয়েছে। যদিও একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইন পরিবর্তনেরও সুযোগ রয়েছে, তবু এটি বিদেশি আমানতকারীদের জন্য শঙ্কার পরিবেশ তৈরি করবে না।
অর্থ পাচার নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিতান্তই আশঙ্কার জায়গা থেকে করা হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই আইনের মাধ্যমে নতুন কিছু সংযোজন করা হয়নি। চলমান প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে অর্থ পাচারের নতুন ক্ষেত্র তৈরির অভিযোগ যুক্তিযুক্ত নয়। তারা বলছেন, পাচারপ্রবণতা যেহেতু আগেও ছিল, তা হয়তো এখনও থাকবে; তবে আইনের মাধ্যমে পাচারকারীদের বাড়তি সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন আইনের মাধ্যমে পাচারপ্রবণতা বাড়বে এমনটা আমি মনে করি না। বরং আইনে ট্যাক্স মওকুফসহ বেশ কিছু সুবিধা যুক্ত হয়েছে যা দেশে বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ চাপে রয়েছে, বাজারে ডলার সংকট আছে। তাই অফশোর ব্যাংকিংয়ে সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডলার সংকট নিরসনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অফশোর ব্যাংকিং আইন পাস হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিলটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করলে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলের কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত না থাকায় বিলটি নিয়ে সমালোচনা করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার বাড়ার আশঙ্কা করেন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, অফশোর ব্যাকিং আগে থেকেই আছে। তবে সেটা ছিল সীমিত- আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেহেতু আইনে নতুন কিছু নেই, তাই এর মাধ্যমে অর্থ পাচার বাড়ার কোনো কারণ নাই। বরং এই বিলের মাধ্যমে অফশোর ব্যাংকিংয়ের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।’ তিনি বলেন, ‘এই আইনের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা, ট্যাক্স আরোপ না করাসহ অনেকগুলো জটিলতা দূর হয়েছে। ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ট্রেড ফাইন্যান্স পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে অনেক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’
তবে ডলারপ্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী নন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি মনে করেন, ‘নতুন আইনের ফলে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর মাধ্যমে ডলারের জোয়ার হবে তা কিন্তু নয়। কারণ বিনিয়োগের পরিবেশ, নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা জরুরি। ম্যাক্রো ইকোনমিতে যে অস্থিরতা তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে না।’
অফশোর ব্যাংকিংয়ের আইনি ভিত্তি তৈরির পেছনে রিজার্ভ বৃদ্ধির উদ্দেশ্য রয়েছে সরকারের। আইনটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই আইন তৈরি করা হচ্ছে শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক রিজার্ভ ও আর্থিক কাঠামো সমৃদ্ধ করেছে। তারা বিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট পেয়েছে।’
অফশোর ব্যাংকিংব্যবস্থায় বৈদেশিক উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় তহবিল সৃষ্টি হয় এবং প্রচলিত ব্যাংকিং আইনকানুনের বাইরে আলাদা আইনকানুনের মাধ্যমে এ তহবিল পরিচালিত হয় ও হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ অফশোর ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের ভেতরে আলাদা এক ব্যাংকিংব্যবস্থা। স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে নির্ধারিত বৈদেশিক মুদ্রায় অফশোর ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। নতুন বিলে এ ব্যাংকিং পরিচালনায় বেশ কিছু বিষয় সুস্পষ্ট করা হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, অফশোর ব্যাংকিং অর্থ বহি উৎস এবং অনুমোদিত বিশেষায়িত অঞ্চলে পরিচালিত শতভাগ বিদেশি মালাকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রাপ্ত তহবিল দিয়ে এই আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী অনিবাসী বা ক্ষেত্রমতো বাংলাদেশে নিবাসী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচালিত ব্যাংকিং কার্যক্রম।
তফশিলি ব্যাংকগুলো অফশোর ব্যাংকিং করতে পারবে। এ বিষয়ে বিলে বলা হয়েছে, অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট তফশিলি ব্যাংক পর্ষদের অনুমোদিত নীতিমালা থাকতে হবে। তফশিলি ব্যাংকের অফশোর কার্যক্রমের জন্য পৃথক হিসাবপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ইউনিট থেকে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে তহবিল স্থানান্তর করা যাবে বলেও বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট যেকোনো অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব পরিচালনা করতে পারবে। অফশোর ব্যাংকিং ব্যবসায় অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট কর্তৃক আমানতকারী বা বৈদেশিক ঋণদাতাদের প্রদেয় সুদ বা মুনাফা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করমুক্ত থাকবে।
এত দিন আইন না থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশে অফশোর ব্যাংকিং চালু আছে ১৯৮৫ সাল থেকে। পরে ২০১৯ সালে অফশোর ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর কয়েকটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়।