প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৪৭ পিএম
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২ ১৬:৫৮ পিএম
ইআরএফ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। প্রবা ফটো
অর্থ পাচারকারীদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। আজ (শনিবার) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম-ইআরএফ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ দাবি জানান।
ইআরএফ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সভায় জসিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘অর্থ পাচারকারীদের তথ্য যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আছে তাদের নাম সুনির্দিষ্টভাবে বের করার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু মুখে মুখে বলা হবে অর্থ পাচার হচ্ছে, কিন্তু কোনো শাস্তি হবে না তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বলার সঙ্গে সঙ্গে কাজেরও বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থ পাচারের অবসান হওয়ার দরকার।’
আলোচনায় আইএমএফের ঋণ সহায়তা বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘আইএমএফ শর্ত দেবেই। তা নেগোসিয়েশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুষ্ঠুভাবে আলোচনার ভিত্তিতেই সঠিক পথে যেতে হবে। অন্যান্য দেশকে ঋণ দেওয়ার জন্য যে শর্ত দেওয়া হয়, তা আমাদের অনুকূল না-ও হতে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে জসিম উদ্দিন বলেন ‘এ মুহূর্তে সুদের হার বৃদ্ধি করা হলে ক্ষতির মুখে পড়বেন শিল্পোদ্যোক্তারা। সুদের হার না বাড়িয়ে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি দক্ষ হতে হবে। ব্যাংকের খরচ সাশ্রয়ী হতে হবে। দেখা যায় অনেক ব্যাংক জাঁকজমকভাবে শাখা খুলে খরচ বাড়াচ্ছে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে দক্ষভাবে ব্যাংকগুলোকে চলতে হবে।’
ব্যাংকের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলার বেশ অভাব রয়েছে। সুযোগ পেলেই মুনাফা হাতিয়ে নেয়। ডলার নিয়ে যে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এর মধ্য দিয়ে কোনো কোনো ব্যাংক প্রতি ডলারে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লাভ করেছে। এতে কয়েকটি ব্যাংক ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লাভ করেছে। তাই ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা খুবই প্রয়োজন।’
ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদের ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার অনীহার বিষয় তুলে ধরে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এসএমইদের ঋণ দিতে চায় না। অথচ এ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই ঋণ পরিশোধে এগিয়ে। বরং খেলাপি হচ্ছে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা। দেখা যায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে বিভিন্ন এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েও তা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। তাহলে ব্যাংক কেন ভয় পাচ্ছে এসএমইদের ঋণ দিতে? এসএমইদের ঋণ সুবিধা ব্যাংকগুলোর অবশ্যই দিতে হবে। তা হলেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স ও অ্যাকসেস টু মার্কেটের সমস্যার সমাধান হবে।’
জ্বালানি সংকট নিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ালেও লোডশেডিং কমেনি। যে জায়গায় লোডশেডিং রেশনিং করে হওয়ার কথা ছিল সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েই যাচ্ছে। এখন অধিকাংশ কারখানাই গ্রামাঞ্চলে। আর এ গ্রামাঞ্চলগুলোয় ৪০ শতাংশের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ কম করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারকে বলেছি বেশি দাম হলেও গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার। আপাতত যেন উৎপাদন কার্যক্রমটা ঠিকভাবে থাকে সেদিকে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়ে উঠছে না উল্লেখ করে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সরকার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। তার পরও কোথায় যেন একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমির শিক্ষায় বেশ ফারাক থেকে যাচ্ছে। তাই এদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে লোকবল পাঠালে বা গেলেও দক্ষ জনবল যাচ্ছে না। এতে আমরা বেশ পিছিয়ে থাকছি। দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শ্রমের মজুরি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দরকষাকষিও করতে পারি না।’
আমদানি-রপ্তানির পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা রপ্তানি আয়ে পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। পোশাকের বাইরে রপ্তানি আয় বাড়াতে পারিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে আমাদের প্রচুর কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এতে আমদানি-রপ্তানির একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে কাঁচামাল তৈরির ওপর। এ ছাড়া পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগী হতে হবে। কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার এবং ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে।’
ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বৃদ্ধির বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বাড়াতে নতুন নতুন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়েও এনবিআর অফিস তৈরি করতে হবে। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতিও বাড়াতে হবে।’
ভবিষ্যৎ মন্দা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিই এখন চাপে রয়েছে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কৃষিতেই নজর বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।’