জোনায়েদ মানসুর
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:০২ পিএম
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান। প্রবা ফটো
কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি বেকার যুবকদের সহায়তা দিতে ২০১১ সালে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। ব্যাংকটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- কোনো গ্রাহক ঋণ নিয়ে মারা গেলে তার পরিবারকে ওই ঋণের দায় নিতে হয় না। তা ছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে কোনো জামানত দিতে হয় না। সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জোনায়েদ মানসুর
প্রবা : গ্রাহকসেবা দিতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
মজিবর রহমান : এ ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ব্যাংকের ঋণ পেতে অনেকে দালালের খপ্পরে পড়তেন, এখন দালালমুক্ত। প্রতিটি শাখাই সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে পেরেছি। আমাদের শাখা কম হওয়ার কারণে সোনালী পেমেন্ট গেটওয়েতে যুক্ত করতে পেরেছি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে। আগে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করতে হতো। এখন নিজস্ব ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে। চেকের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারে। গ্রাহকরা ডিপোজিট করতে পারে। আমরা এসএমই ঋণ চালু করেছি, শিগগিরই কৃষি ঋণও চালু হচ্ছে। গত এক বছরে নতুন ২০টি শাখা করতে পেরেছি। বর্তমানে আমাদের ১২০টি শাখা রয়েছে। ব্যাংকারদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ট্রেনিং সেন্টার চালু করেছি।
প্রবা : ঋণ পেতে গ্রাহককে কি কোনো জামানত দিতে হয়?
মজিবর রহমান : প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ঋণ পেতে কোনো জামানত লাগে না। এ ব্যাংকে ঋণ পেতে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হয় না। পাসপোর্ট, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিশন ঠিক থাকলে আবেদনের সাত দিনের মধ্যেই ঋণ দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকরা তিন দিন বা আরও কম সময়ের মধ্যেও ঋণ পেয়ে থাকেন। সর্বোচ্চ ২ বা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ‘সহজামানত’ রাখতে হবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিও দেওয়া হয়। কেউ চাইলে ১ লাখ বা ৫০ হাজার টাকাও ঋণ নিতে পারেন। ঋণের মেয়াদ দুই বছর। এর সুদের হার ৯ শতাংশ। তবে এর ঊর্ধ্বে হলে দেড় গুণ সমপরিমাণ সহজামানত জমা দিতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় কেউ যদি ঋণ নিয়ে কোনো কিস্তি পরিশোধ না করে মৃত্যুবরণ করেন, তাকে সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফ করে দেওয়া হয়।
প্রবা : কোন দেশে যাওয়ার জন্য বেশি ঋণের আবেদন পান?
মজিবর রহমান : বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ভাইবোনদের ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে ১১৭টি দেশে পৌঁছে গেছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। সৌদি আরবে বেশি প্রবাসী তাই ঋণের জন্য এ দেশের প্রবাসীদের কাছ থেকেই বেশি আবেদন পাই। এ ছাড়া দুবাই, ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন গমনে ইচ্ছুক ব্যক্তিরাই বেশি আবেদন করেন। তবে সম্প্রতি ইতালি, রোমানিয়া, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রেও ঋণের আবেদন চোখে পড়ার মতো।
প্রবা : অভিবাসন ঋণ ছাড়া আর কোন খাতে ঋণ দেওয়া হয়?
মজিবর রহমান : ৯ শতাংশ সুদহারে বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিকরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন। যা ১০ থেকে ২০ কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। অভিবাসী কর্মীদের সহায়তা প্রদানে বিভিন্ন ঋণসেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অভিবাসন ঋণ, পুনর্বাসন ঋণ, বঙ্গবন্ধু অভিবাসী বৃহৎ পরিবার ঋণ এবং এ ছাড়া বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ। শুধু বঙ্গবন্ধু অভিবাসী বৃহৎ পরিবার প্রকল্প ঋণে ১ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। এক্ষেত্রেও ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ। এ ছাড়া বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ প্রকল্পে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ দিচ্ছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্যে সহজামানতবিহীন এবং ২ লাখ টাকার অধিক ঋণের জন্য জামানতসহ ঋণ নিতে পারবেন। এই বিশেষ ঋণের সুদের হার মাত্র ৪ শতাংশ। অবশ্য সঞ্চয় প্রকল্প, মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প ও দ্বিগুণ আমানত প্রকল্প চালু রয়েছে এ ব্যাংকে। প্রকল্পগুলো হলো বঙ্গবন্ধু সঞ্চয়ী স্কিম, বঙ্গবন্ধু ডাবল বেনিফিট স্কিম এবং বঙ্গবন্ধু শিক্ষা সঞ্চয়ী স্কিম ও বিবাহ সঞ্চয়ী স্কিম। এ ছাড়া বিদেশফেরত প্রবাসীদের জন্য ১১টি খাতে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে এক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। সরল সুদের এই ঋণের মেয়াদ হবে খাত অনুযায়ী এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে।
প্রবা : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মজিবর রহমান : বর্তমানে গ্রাহকসংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ সোয়া ২০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকা। আমাদের কোনো প্রভিশন ঘাটতি নেই। বরং উদ্বৃত্ত রয়েছে ৮ কোটি টাকা। আমাদের ঋণের শ্রেণীকরণের হার ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বলা আছে ৫ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। এখানে কাজ করতে হবে। ওভারডিউ কমাতে কাজ করব। প্রবাসী কল্যাণ নামে একটি অ্যাপ চালু করার পরিকল্পনা আছে। এ অ্যাপের মাধ্যমে যাতে প্রবাসীরা বিদেশে বসেও সব ধরনের লেনদেন করতে পারে। শাখা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ে আসতে সম্প্রসারণের জন্য বৃহত্তর জেলায় জেলায় শাখা স্থানান্তরও করতে হবে। সিবিএস পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করব। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক যাতে কাজ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।