প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ২১:৫৬ পিএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:১৫ পিএম
প্রবা ফটো
ব্যাংক খাতে দিন দিন গভীর হচ্ছে তারল্য সংকট। এতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারও ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে হঠাৎ নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে। তারল্য সংকটের কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে স্বল্পসময়ের জন্য ধার করা অর্থের সুদের হার বা কল-মানি রেট বাড়ছে। বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) এই বাজারে রেকর্ড সাড়ে ১২ শতাংশ সুদে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো ধার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
হঠাৎ কল-মানির সুদহার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ব্যাংকাররা বলছেন, বছরের শেষ সময়ে এসে ব্যাংকগুলোকে তাদের স্থিতিপত্র বা ব্যালেন্সশিট চূড়ান্ত করতে হয়। এতে সব ব্যাংকেরই নগদ অর্থের চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে বছরের শেষ সময়ে এসে কল-মানিতে সুদহার বেড়েছে।
এ ছাড়া বেশ কিছু ব্যাংক বর্তমানে তারল্য সংকটে ভুগছে। এ কারণে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে অন্য ব্যাংক থেকে ধার নিতে হয়েছে। তাতে নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সুদহার বেড়েছে।
আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সম্প্রতি টাকা ধারের খরচ বেড়েছে। মূলত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি, আমানতের ধীর প্রবৃদ্ধি ও সরকারের ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ায় এ খাতে দিন দিন তারল্য সংকট তীব্র হচ্ছে। এ সংকট সামাল দিতে এক ব্যাংক ছুটছে আরেক ব্যাংকের কাছে। কিন্তু আন্তঃব্যাংকে প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান নেই। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তহবিল সংকট কাটাতে উচ্চ সুদেও আমানত সংগ্রহ করছে অনেক ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। সর্বোচ্চ ৬ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশের মধ্যে এসব লেনদেন হয়েছে। এদিন ১৪ দিন মেয়াদি ধারের সর্বোচ্চ সুদ ওঠে সাড়ে ১২ শতাংশ। কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে এই সুদে ১৫৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। ৩২ দিন মেয়াদি ধারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে ৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
১৫ দিন মেয়াদি ধারের সুদ ওঠে সাড়ে ১১ শতাংশ, লেনদেন হয় ৫০ কোটি টাকার। সাত দিন ও পাঁচ দিন মেয়াদি ধারের সুদ ওঠে ১১ শতাংশ। এ দুটির ক্ষেত্রে লেনদেন হয় যথাক্রমে ৬৫ কোটি ও ৯৮ কোটি টাকা। আর এক দিন মেয়াদি কল-মানির সর্বোচ্চ সুদ ছিল সাড়ে ৯ শতাংশ, লেনদেন হয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া বুধবার এই বাজারে ৯১ দিন, ৯২ দিন ও ১৮৩ দিন মেয়াদের জন্যও ধার দেওয়া-নেওয়া হয়। এসব উপকরণের সুদহার ছিল ৬ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে গড় সুদহার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ধারের সুদ এত বাড়ার কথা নয়। হয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করার ডকুমেন্টস ছিল না। ফলে চড়া সুদে হলেও অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে বাধ্য হয়েছে। এর অর্থ আন্তঃব্যাংকেও নগদ টাকার সংকট বেড়েছে। ফলে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেনও কমে গেছে।‘
অন্যদিকে মঙ্গলবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রায় ৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদ উঠেছিল ১২ শতাংশ। ওই দিন ৯২ দিনের ধারের জন্য এই সুদ ওঠে। এ ছাড়া ওই দিন ৭, ১৩ ও ১৪ দিন মেয়াদি ধারের সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ, ছয় দিন মেয়াদির সুদ ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ, দুদিন মেয়াদি, ৩০ দিন মেয়াদি ও ৯০ দিন মেয়াদির সুদহার ছিল ১১ শতাংশ এবং আট দিন মেয়াদি ও ৯ দিন মেয়াদির সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর এক দিন মেয়াদি কল-মানির সুদহার ছিল সাড়ে ৯ শতাংশ।
আন্তঃব্যাংকের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও অর্থ ধার নেওয়ার সুদহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। তারপরও প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ধার করছে ব্যাংকগুলো। মঙ্গলবার বিভিন্ন উপকরণের আওতায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের দিন সোমবার এই ধারের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। আর ২০ ডিসেম্বর ২৪ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদি ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ছিল এ যাবতকালের রেকর্ড। এর আগে ২৫ অক্টোবর সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা ধার নেওয়ার রেকর্ড ছিল।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের ঋণের সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি সব ধরনের নীতি সুদহার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সুদের হার আরেক দফা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে, আগে যা ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা স্পেশাল রেপো বা এসএলএফ-স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির সুদহার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সংকটে পড়া ব্যাংক উচ্চ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে। এ ছাড়া সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিলের সুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এখন স্মার্ট রেট ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ, ব্যাংকগুলো এর সঙ্গে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ যুক্ত করতে পারছে। তাতে চলতি ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদ উঠেছে ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক আরও সংকোচনমূলক মুদ্রা সরবরাহের পথে হাঁটছে। এতে বাজারে নগদ অর্থের সংকট আরও বেড়েছে।