প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৭:২৩ পিএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৭:৫০ পিএম
ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ : নির্বাচন, অর্থনীতি ও বহিঃসম্পর্ক শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবা ফটো
একটা একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। ইতোমধ্যেই সিট ভাগাভাগি হয়ে গেছে। এটা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়, ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয়েছে। যার কারণে সার্বিক অর্থনীতিতেও হুমকির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার।
বুধবার (২০ ডিসেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ : নির্বাচন, অর্থনীতি ও বহিঃসম্পর্ক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ নেন সাবেক আমলা, কূটনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।
আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ’১৯৯১ সালের পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের মানুষেরা একবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ১৯৯৫-এর পরে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা এখন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। ধীরে ধীরে এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে আমাদের দেশের সবকিছু। তাই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নতুন হুমকি হিসেবে সামনে উপস্থিত হয়েছে। এখন পক্ষপাতের প্রয়োজন হলে কাদের ওপর আমাদের অর্থনীতি নির্ভরশীল, বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নির্বাচনে মনোনয়ন কেনা প্রার্থীদের প্রদর্শিত আয়ের তথ্য পুরোপুরি সত্য মনে করার অবকাশ নেই। প্রার্থীদের আসল সম্পদ আরও বেশিও হতে পারে। তবে কতজন প্রার্থী নিয়ম মেনে ভ্যাট ট্যাক্স প্রদান করে, বিষয়টি তদারকি করা উচিত।‘
একই অনুষ্ঠানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘বিরোধী দল খোঁজার’ প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘সিট (আসন) ভিক্ষা করার রাজনীতি চলছে। ২৬ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের ১৩টি দলের নামও কেউ বলতে পারবে না। আসন ভাগাভাগির পর সরকারি দলের ২৪০ আসন নিশ্চিত।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ’এক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে অথবা দুই মাসের মধ্যে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে ইত্যাদি কথা বলে জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নীতির ভুলের কারণে আজকে আমাদের অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। আর অর্থনীতি খারাপ হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। আমাদের দেশে যতটা না প্রকৃত উন্নয়ন হয়েছে তার চেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে কয়েকটি সূচকের। এর ফলে যে সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা পাচ্ছে একটি বিশেষ শ্রেণির লোকেরা।’
তিনি আরও বলেন, ’গ্রামের মানুষও এখন স্যান্ডেল পরে, পার্লারে যায় এবং জিম করে। এগুলোর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প শোনানো হয়। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন এগুলোর মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায় না। কিছু মানুষের আয় বেড়েছে অসমহারে। আবার কেউ কেউ কিছুই পাচ্ছে না। সুতরাং এই ভারসাম্যহীন উন্নয়ন কোনো কাজে আসছে না।’
ঋণখেলাপিদের সম্পর্কে সাবেক এই গভর্নর বলেন, ’কথায় কথায় বলতে শোনা যায়—উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও দুর্নীতি হয়। আমাদের দেশে কেন হবে না!’ এই কথার উত্তরে তিনি বলেন, ’ওই দেশে কেউ দুর্নীতি করলে তার বিচার হয়। সে জেলে থাকা অবস্থায় একটি ঘড়িও ব্যবহার করতে পারে না। এমনকি সাজা কেটে বের হওয়ার পরে অনেকে আত্মহত্যা করে। কারণ তাকে সামাজিক সব ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে সরকার। কিন্তু আমাদের দেশে পুরোপুরি উল্টো চিত্র।‘
আগামী নির্বাচনে সরকারি দলের হারার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন নিউএজের সম্পাদক নূরুল কবির। তিনি বলেন, ’গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ সুষ্ঠু নির্বাচন। গত ৫২ বছরে এ পদক্ষেপই নেওয়া যায়নি। অসাধু ব্যবসায়ী, অসাধু রাজনীতিবিদ ও আমলারা মিলে একটি চক্র তৈরি করেছে। এই চক্র ভাঙা ছাড়া পথ নেই।’
সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে একদলীয় নির্বাচন করতে যাচ্ছে বলে মনে করেন নূরুল কবির। তিনি বলেন, ‘ভারত, রাশিয়া ও চীন সমর্থন দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে আমরা অর্জিত আয় দিয়ে পণ্য ক্রয় করি। ইউরোপ, আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করে আয় করি। এক জায়গায় আমরা খরচ করি, আরেক অঞ্চল থেকে আয় করি। স্বার্থ কোন দিকে বেশি, সেই অর্থনৈতিক অঙ্কও হিসাব করতে হবে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ’আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বৈধতার সংকট দেখা দিয়েছে। এ সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক বৈধতা নেই। নৈতিক বৈধতার ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া কোনোটাই কাজ করছে না। সবকিছু একটি দলকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার কারণে ন্যায় ও ন্যায্যতা নেই। বিচারব্যবস্থা সবার জন্য সমভাবে কাজ করছে না। অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে বিশাল বৈষম্য। কিন্তু রাজনীতি ও অর্থনীতি একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাভঙ্গিভাবে জড়িত। তার সঙ্গে বৈশ্বিক সম্পর্কও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে থাকলে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।’ তাই অধিকার প্রতিষ্ঠায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।