জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:৪৮ এএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:২২ এএম
দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আস্থার সংকট জেঁকে বসেছে। ফলে ক্রমেই নিম্নগামী ঋণ বিতরণ ও আদায়। অন্যদিকে বকেয়া ঋণের পরিমাণও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। তাই আর্থিক খাতকে বাঁচাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শক্ত পদক্ষেপ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২৮৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ কমেছে। আদায় কমেছে ১৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে পুরো খাতের বকেয়া ঋণের পরিমাণ এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আস্থা হারাচ্ছে। এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এতে জীবনযাপনের খরচ বেড়ে গেছে, সেই সঙ্গে কমছে প্রকৃত আয়। এসব কারণে আমানত হিসাব কমেছে। এ ছাড়া আর্থিক মন্দার কারণে সময়মতো ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না গ্রাহক।
তথ্য মতে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে পূর্বের বিতরণ করা ঋণ থেকে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৭৫৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। কিন্তু আগের তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) ৬ হাজার ৯০০ কোটি ২৭ লাখ টাকা আদায় করেছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সুতরাং তিন মাসের ব্যবধানে এই খাতের আদায় কমেছে ১৪৬ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বকেয়া বা ওভারডিউ ছিল ১৩ হাজার ৬২৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর আগের প্রান্তিকে যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা কম। কারণ এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে ১২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা ছিল মোট বকেয়ার পরিমাণ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে বকেয়া ঋণ। ক্রমান্বয়ে জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে মোট বকেয়া ছিল ১২ হাজার ৪৭৫ কোটি এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে ছিল ১১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
এসব বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খারাপ হওয়ার দুটি কারণ। প্রধান কারণ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন নেই। ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা ঘটনা তো আছে। এজন্য আমানতকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আর অন্যটি হচ্ছে, দেশের মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কষ্টে আছে। আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় তারা আমানত তুলে হিসাব বন্ধ করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না কিছু কিছু গ্রাহক।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারী ছিল ৫ লাখ ৭০ হাজার ১৯৬ জন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার ২৭৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারী হারিয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ জন। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারী হারিয়েছে ২৫ হাজার ৭৮২ জন। গত জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতকারীর পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬১ জন।
তবে আশার দিক হচ্ছে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। আর তিন মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত বেড়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা। গত জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত ছিল ৪৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। তিন মাসে আমানত বেড়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি সরকারি, ১২টি দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানায় এবং বাকিগুলো দেশীয় ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারল্য সংকটে। অবস্থা এমন পর্যায়ে যে, আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এখন নাজুক।