× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্রিসেন্ট গ্রুপ ডোবাচ্ছে জনতা ব্যাংককে

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৩ ০৮:৫৬ এএম

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৩৯ এএম

ক্রিসেন্ট গ্রুপ ডোবাচ্ছে জনতা ব্যাংককে

২০১৮ সালে ১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে আলোচনায় আসে ক্রিসেন্ট লেদার। তবে জনতা ব্যাংক থেকে তাদের ঋণ জালিয়াতি শুরু হয়েছিল তারও আগে, ২০১৩ সালে। ১০ বছর পার হয়ে গেলেও সেই ঋণ আজও শোধ করেনি চামড়া খাতে একসময়ের আলোচিত নাম- ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

জনতা ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপিদের তালিকায় উঠে এসেছে এই গ্রুপের নাম। তবে হাজার কোটি টাকার ঋণও তাদের কাছে যেন কিছুই না! এমনটা মনে হওয়ার কারণ, এ বিষয়ে ঋণদাতা জনতা ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা ক্রিসেন্ট গ্রুপের কথা বলতে না চাওয়া। দুপক্ষই মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। কী জনতা ব্যাংক, কী ক্রিসেন্ট গ্রুপ- বিষয়টি নিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কেউই সাক্ষাতের সুযোগ দেননি। এমনকি ফোনেও কথা বলা যায়নি। 

জনতা ব্যাংক ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ

জনতা ব্যাংকের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৭৪৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণের সূত্রে ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপিদের তালিকায় নাম উঠেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের। যদিও গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি। ওই বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে নেওয়া ফান্ডেড ঋণ ১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে নন-ফান্ডেড ঋণ ৬০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়াও গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গ্রুপ ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মিলে জনতা ব্যাংকে এখন তাদের মোট ঋণ ৩ হাজার ৪৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনেও ঋণ নিয়ে ক্রিসেন্ট গ্রুপের অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জব্বারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে গণসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে অফিসিয়াল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়। যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই বিভাগের প্রধান। অন্যদিকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদেরের সঙ্গেও একাধিকবার মোবাইলে কথা বলার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে

২০১৯ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জনতা ব্যাংক থেকে আমদানি-রপ্তানিসহ নানা উপায়ে ঋণ বের করে নিয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। যার একটি অংশ পাচার হয়েছে। কিছু অর্থ দিয়ে সাভার, হাজারীবাগসহ ঢাকার আশপাশে জমি কেনা হয়েছে। ঋণ আদায়ে ক্রিসেন্ট গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রির জন্য জনতা ব্যাংক দুই দফা নিলাম ডেকেও তা বিক্রি করতে পারেনি। মূলত সম্পদমূল্যের তুলনায় ব্যাংকের পাওনা কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় এবং উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিলাম কার্যক্রম স্থগিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা থেকে এসব ঋণ ব্যাংকটির লোকাল অফিসে স্থানান্তর করা হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হংকংয়ে নিবন্ধিত মোট ২১টি প্রতিষ্ঠানে শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ৭২২ কোটি টাকার ভুয়া রপ্তানি দেখায় ক্রিসেন্ট গ্রুপ। কোনো রপ্তানি না করে ভুয়া রপ্তানি বিল তৈরি করে জনতা ব্যাংক ও অডিট ফার্মের যোগসাজশে সরকারি খাতের নগদ সহায়তা নেওয়া হয়। আবার সেই ভুয়া রপ্তানি বিলের বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধা দেয় ব্যাংক। এই ২১টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই পরিচালক বা কোম্পানি সেক্রেটারি ছিল বাংলাদেশি। আর যেসব ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানগুলো রেজিস্টার্ড দেখানো হয়েছে, তার সবই অস্তিত্বহীন। ভিন্ন ভিন্ন দেশে রপ্তানি দেখানো হলেও অর্থ এসেছে দুবাইয়ের এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে। ফলে রপ্তানি না করেই নগদ সহায়তা নেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অর্থ প্রেরণ করে সে অর্থ দেশে এনে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন দেখানো হয়।

ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে নগদ সহায়তার নামে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪০৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা নেয় ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। আর ২০১৩ সাল থেকে ক্রিসেন্টকে দেওয়া হয় ৭০৮ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নেওয়া নগদ সহায়তার অর্থ ২০১৮ সালের জুলাইয়ে জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে কেটে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নিয়ম মানেনি জনতা ব্যাংক

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানেনি জনতা ব্যাংক। যে কারণে একসময় সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত জনতা ব্যাংক এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যাগ্রস্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৩ সালের জুন শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। এককভাবে আর কোনো ব্যাংকের এত খেলাপি ঋণ নেই। হিসাব অনুযায়ী, তাদের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৬৪ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে জনতা ব্যাংকে ২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একসময়ে মুনাফায় থাকা ব্যাংকটি এখন বড় লোকসানে পড়েছে।

ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২ শেষে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ছিল ১৩ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। তার মানে ৮ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঘাটতিতে থাকার কথা। কিন্তু খাতা-কলমে কোনো প্রভিশন ঘাটতি নেই জনতা ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া ডেফারেল নামক বিশেষ সুবিধার জোরে ব্যাংকের সম্পদকে ঝুঁকিমুক্ত প্রমাণ করেছে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। প্রকৃতপক্ষে এই প্রভিশন রাখার জন্য বিশেষ বিবেচনায় জনতা ব্যাংককে ৯ বছরের অতিরিক্ত সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, 

‘বড় প্রভাবশালী গ্রাহকের কাছে পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিয়ম মেনে ঋণ না দেওয়ায় এত ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। আবার খেলাপিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিও উদার। এজন্য অনেকেই ইচ্ছা করে ঋণ   শোধ করছে না। এর ফলে মানুষের আমানত আরও ঝুঁকিতে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের ধরে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি ব্যাংক খাতের প্রতিটি স্তরে সুশাসন কায়েম করা এখন সময়ের দাবি।’

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের মামলায় ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যান এম এ কাদেরকে ২০১৯ সালের শেষের দিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে দুই মাস পরই জামিনে মুক্ত হন তিনি। ওই সময় শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, ক্রিসেন্টের তিন প্রতিষ্ঠান দেশ থেকে ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পাচার করেছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে রাজধানীর চকবাজার মডেল থানায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বাদী হয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়- ক্রিসেন্টের প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানির আড়ালে অবৈধ পন্থায় দেশ থেকে টাকা পাচার করেছে। এনবিআরের তদন্তেও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ৪২২ কোটি ৪৬ লাখ, রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড ৪৮১ কোটি ২৬ লাখ ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ লিমিটেড ১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা পাচার করেছে। মোট টাকার পরিমাণ ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা