বৈঠকে সানেম
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:৫১ পিএম
দেশের আর্থিক সংকট নিরসনে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) সঙ্গে বৈঠক হয়েছে সোমবার (২৩ অক্টোবর)।
বৈঠকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডলার সংকট নিরসনে সম্প্রতি নেওয়া আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসবে না। ডলার রেট পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। বৈঠক শেষে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রবাসীরা বর্তমান বিনিময় হারের সঙ্গে বাড়তি পাঁচ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন। এর মধ্যে সরকার থেকে দেওয়া হচ্ছে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা। এর সঙ্গে আরও আড়াই শতাংশ পাবেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুাষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চার ডেপুটি গভর্নর, অর্থ-সচিব খাইরুল আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান এবং সানামের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক ডক্টর সেলিম রায়হান ও সাইমা হক বিদিশা।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেশের আর্থিক সংকট নিরসনে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো হয়। তবে সানেম জানায় এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে। ইতোমধ্যে ব্যাংকঋণের সুদহারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে এটা বাজারভিত্তিক না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিং নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি।
ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতি পরিবর্তন ছাড়াও বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ আমাদের দেশে মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এই জায়গাগুলোতে আলাদাভাবে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ব্যাংকের পক্ষ থেকে রেমিট্যান্স কেনায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটা কাজে আসবে না। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত ডলারের অফিসিয়াল এবং আনঅফিসিয়াল রেটে পার্থক্য থাকবে, ততক্ষণ রেমিটাররা অবৈধ পথেই ডলার পাঠাবেন। এ ছাড়াও একটা শ্রেণি রয়েছে যারা হুন্ডির মাধ্যমে ব্যবসা করে। এই চ্যানেলটা বন্ধ করার জন্য শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় ততক্ষণ ফরেন কারেন্সিতে একটা আশঙ্কা থেকেই যাবে। এ ছাড়াও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণসহ আর্থিক খাতের সুশাসন ফেরাতে না পারলে নীতি পরিবর্তনের সুফল যথাযথভাবে আমরা পাব না।
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে একই বিষয়ে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেদিন নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ না দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। কেননা এ ধরনের প্রবণতা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
গণমাধ্যমকে তিনি আরও জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে বাজারে লাগাম টানার আগে ‘মূল্য প্রত্যাশা’র লাগাম টানার পরামর্শ দিয়েছি। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছি।’ এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও তাতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলে জানান এ অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, ‘পণ্যের দাম বাড়বে-এমন প্রত্যাশা যখন স্থায়ী হয়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্যমূল্য বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম বেঁধে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং মূল্য প্রত্যাশা কমাতে সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য নীতি গ্রহণ এবং তার মাধ্যমে বাজারে সংকেত দিতে হয়। এ ছাড়া দৃশ্যত যেখানে একচেটিয়া ব্যবসা গড়ে ওঠে, সেখানে তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলেছি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে বিবেচনায় অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গভর্নর। তিনি বর্তমান মুদ্রানীতির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ না দেওয়ার জন্য গভর্নরকে পরামর্শ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে অন্যান্য অর্থনীতিবিদ, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স এবং অর্থনৈতিক খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকবে।’