তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:২২ এএম
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:১৪ পিএম
কোল্ডস্টোরেজে রাখা হয়েছে আলু। প্রবা ফটো
যশোরের বাজারে যে আলুর কেজি ছিল ৩০ টাকা, মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তার দাম বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা। অথচ গত বুধ ও বৃহস্পতিবারও যশোর বড় বাজার, রেল স্টেশন বাজার, নিউ মার্কেট বাজারসহ যশোরের খুচরা পর্যায়ের বাজারে গিয়ে পর্যাপ্ত আলুর সরবরাহ দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি দোকানে মানভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আলুর বাজার এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে সক্রিয় রয়েছে আলু ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত সাত ব্যবসায়ী।
স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, যশোর বড়বাজার আলুপট্টি থেকে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪১ টাকা করে কিনে এনেছি। তবে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করছি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। একই তথ্য জানান খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম, সালাম, মমিনসহ অনেকে।
বড় বাজারের যশোর এজেন্সির মালিক আব্দুল মান্নান বলেন, আলুর আড়তদারদের কোনো কারচুপি নেই। তবে কোল্ডস্টোরে যারা আলু সংরক্ষণ করেন আলুর দাম তারাই বাড়িয়ে থাকেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অঞ্চলে আলুর বাজার ঊর্ধ্বগতির মূলে রয়েছেন যশোরের ৭ আলু ব্যবসায়ী। তারা হলেন- যশোর কোল্ডস্টোরেজের মালিক সানোয়ার হাজী, আলু চাষি সমিতি ও ব্যবসায় সমিতির সভাপতি সঞ্জীবন ভদ্র, ঝিনাইদহের মহেশপুর এলাকার সুশান্ত, বড়বাজারের শিহাব (যিনি বড়বাজারে পুরি-শিঙাড়া বিক্রি করেন), যশোর ঝিকরগাছা গদখালী এলাকার আব্দুল হালিম (যিনি একজন ওষুধ ফার্মেসির দোকানদার), একই এলাকার আলম খান, জেলার চৌগাছা উপজেলার শিল্পপতি হাসানুজ্জামান রায়হান।
এ ছাড়া এই তালিকায় আরও আছেন জেলার মনিরামপুর উপজেলার ইউসুফ আলী, একই উপজেলার নাসির উদ্দিন, রবিউল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন প্রমুখ।
এসব ব্যবসায়ী যশোর অঞ্চলের বারোটি কোল্ডস্টোরেজ আলুর মৌসুমের আগেই চুক্তিবদ্ধ করে রাখেন। ফলে সাধারণ কৃষক আলু কোল্ডস্টোরেজ করার সুযোগ পান না। এসব মজুদদার ব্যবসায়ী আলুর মৌসুমে কেজি প্রতি ১১ থেকে ১৪ টাকা দরে আলু ক্রয় করে কোল্ডস্টোরেজগুলোতে সংরক্ষণ করেন। এরপর নওগাঁ ও বগুড়ার একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে যশোর অঞ্চলের আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।
যশোর কোল্ডস্টোরেজের মালিক সানোয়ার হাজীর যশোর সেনা কল্যাণ কোলেস্টোরেজে এখনও বিশ হাজার বস্তা আলু রয়েছে। আর সঞ্জীবন ভদ্রের সেনা কল্যাণ, গদখালী, রাজাহাট, কালীগঞ্জের ফারইস্টসহ বিভিন্ন কোল্ডস্টোরেজে রয়েছে ১ লাখ বস্তার বেশি আলু, বড়বাজারের শিহাবের যশোর সেনা কল্যাণ কোল্ডস্টোরেজে আছে ৫৭০০ বস্তা। রাজারহাট ও ঝিকরগাছা মিলে আরও আছে ৫০০০ বস্তা আলু। ঝিকরগাছা গদখালী এলাকার আব্দুল হালিমের সেনা কল্যাণ ও গদখালী কোল্ডস্টোর মিলে রয়েছে ৩৫ হাজার বস্তা, একই এলাকার আলম খানের গদখালী কোল্ডস্টোরে রয়েছে পাঁচ হাজারসহ নাভারন ও যশোর মিলে ৩৫ হাজার বস্তা আলু রয়েছে, জেলার মনিরামপুর উপজেলার ইউসুফ আলীর সেনা কল্যাণ কোল্ডস্টোরে রয়েছে পাঁচ হাজার বস্তা ও জেলার চৌগাছা উপজেলার শিল্পপতি রায়হানের দুটি কোল্ডস্টোরেজে রয়েছে ৫০ হাজার বস্তা আলু। এ শিল্পপতির দুটি কোল্ডস্টোরে আলু সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা দুই লাখ বস্তার অধিক।
এসব ব্যবসায়ী প্রতিদিন দেশের সব থেকে বেশি আলু উৎপাদনের স্থান ঠাকুরগাঁও-এ বিভিন্ন স্টোরেজের মালিকদের মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে বাজারে আলুর দাম নির্ধারণ করে থাকেন।
যশোর টাওয়ার কোল্ডস্টোরের ম্যানেজার আখতারুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কোল্ডস্টোরে এক লাখ ৫৮ হাজার বস্তা আলু ছিল। ইতোমধ্যে কিছু আলু বের হয়েছে। এখনও কোল্ডস্টোরটিতে ৯০ হাজার বস্তার মতো আলু রয়েছে। তার মধ্যে সানোয়ার হাজীরই রয়েছে প্রায় ২০ হাজার বস্তা।
যশোর কোল্ডস্টোরেজের মালিক সানোয়ার হাজীর মোবাইল ফোনের সংযোগ দিয়ে যশোর সেনা কল্যাণ কোল্ডস্টোরে এখনও বিশ হাজার বস্তা আলু থাকা সত্ত্বেও বাজারে আলু না ছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি। আপনি পরে ফোন দেন। পরবর্তীতে বারবার তাকে ফোন দিলেও তিনি তার ফোনটা রিসিভ করেননি।’
যশোর অঞ্চলে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলু চাষি সমিতি ও ব্যবসায় সমিতির সভাপতি সঞ্জীবন ভদ্রের মোবাইল ফোনে সংযোগ দিয়ে জানতে চাইলে তিনি আলু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এসব আলু আমাদের মনে হলেও আমরা প্রকৃতপক্ষে এসব আলুর এজেন্ট। বিভিন্ন লোকজন আমাদের মাধ্যমে কোল্ডস্টোরেজগুলোতে রেখে থাকেন। বিনিময়ে আমরা কোল্ডস্টোর ও আলুর মূল মালিকদের কাছ থেকে একটা কমিশন পেয়ে থাকি। তবে আলুর প্রকৃত মালিক কারা সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগটি বিছিন্ন করে দেন।’
যশোর ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তামান্না তাসনিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে কয়েকটা কোল্ডস্টোরে ভিজিট করেছি। বড় মজুদদারদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এরপর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কৃষি বিপণনের যশোর কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের মোবাইল ফোনে সংযোগ দিয়ে আলুর বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার বাজারে আলু ও পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর বাইরে কেউ অতিরিক্ত দামে আলু ও পেঁয়াজ বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার বলেন, আলুর দাম বাড়ার বিষয়ে বাজার বিপণন কর্মকর্তা ও ভোক্তা অধিদপ্তর কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরই আলু মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।