প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১৫:৫৮ পিএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১৬:৩৪ পিএম
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত 'অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অস্তিত্বশীলতার প্রভাব এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণে উপায়' শীর্ষক এক সভা। প্রবা ফটো
টাকার অবমূল্যায়ন বন্ধে নতুন অর্থনীতিবিদদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক বিচারপতি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রউফ। পশ্চিমা ষড়যন্ত্রে আমাদের দেশের টাকার পরিমান বাড়লেও মূল্য কমে গেছে। অন্যদিকে বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রব্যমূল্যের দাম। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে গেছে সে কথা সবাই বলে। তবে টাকার মান কমেছে তা কেও বলে না। টাকশাল বাংলাদেশের সম্পদের ভান্ডার নয়। টাকা ছাপালেই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান হয় না। সমস্যার মূল থেকে এর সমাধান নিয়ে আসতে হবে। এবং এই দায়িত্বটা তরুণ অর্থনীতিবিদদের।
শনিবার (১৯ আগস্ট) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত 'অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অস্তিত্বশীলতার প্রভাব এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণে উপায়' শীর্ষক এক সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সাবেক এই বিচারপতি বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা টাকার যে মূল্য রেখে গেছে সেটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। তাই এখন টাকার টয়লেট টিস্যুতে রূপান্তরিত হয়েছে। একটা সময় এক পয়সাতে অনেক কিছু পাওয়া যেত। আর এখন দশ টাকার কম ভিক্ষা দেওয়া যায় না। কম দামে পণ্য উৎপাদন করলে বিদেশী ক্রেতারা এখান থেকে পণ্য কিনবেন এই উদ্দেশ্যে টাকার মান কমিয়েও কেন সুফল আসছেনা। এতো এতো অর্থনীতি পড়ে টাকার মান খোয়ালাম কেন। বোকা জনগণ পেয়ে কিছু শ্রেণীর মানুষ অর্থনীতিকে পুঞ্জিভূত করে ফেলেছে। এই সমস্যার সমাধানে আমাদের অর্থনৈতিক ধারণা বা কনসেপ্ট গুলো বদলাতে হবে বলে মনে করেন তিনি। ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রে টাকার মান হারালেও সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য কেউ কখনো কোনো চেষ্টা করেননি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়ে যায় কিন্তু এ কথা কেউ জানে না। এরকমটা কিভাবে হতে পারে। বাঙ্গালীদের ইতিহাস চর্চা এবং গবেষণার মাধ্যমে টাকার মান বৃদ্ধি করতে সামনে এগিয়ে আসার জন্য নতুন অর্থনীতিবিদদের আহ্বান জানিয়েছেন মোহাম্মদ আবদুর রউফ।
রাজনীতি সম্পর্কে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বাংলাদেশের যতদিন নমিনেশন বাণিজ্য থাকবে ততদিন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে না। ভালো ভালো কৌশল বা নীতি দিয়ে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন করার নাম রাজনীতি। কিন্তু নেতাদের মাধ্যমে নীতি পরিবর্তন করার নাম রাজনীতি নয়। সকল রাজনৈতিক দলকে সমান অধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বন্ধ না করলে গণতন্ত্র থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক হাসানাত আলী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। একটি বিশেষ গ্রুপের কব্জায় সাতটি ব্যাংক। বেআইনিভাবে ৮০ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়েছেন ব্যাংক থেকে। বিদেশে পাচার করেছেন টাকা। দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে গেলেও ৭২ বার পেছানো হয়েছে তার চার্জশিট দেওয়ার তারিখ। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে করা হয়েছে রাজনৈতিক লুটপাট। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে সরকার ঘোষণা করেছে পেনশন স্কিমের। যা কোনভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
লিখিত বক্তব্যে সংগঠনটি জানায়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নানাবিধ অসংগতি এবং অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। অস্থিতিশীল অবস্থা দেশী ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারা হ্রাস পায়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণ নিরুৎসাহিত করে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা সম্পদকে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সামাজিক অস্থিরতায়ও এর ভূমিকা লক্ষণীয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রথম শর্ত জনগণের নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার প্রয়োগ। নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আমরা কিছু ব্যবস্থা নিতে পারি।
আমাদের প্রস্তাবনা হলো, জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) একটি ভোটিং ব্যাংকের সাথে সংযুক্ত করা এবং এনআইডি সার্ভারকে ভোটিং ব্যাংক হিসাবে গ্রহণ করে তথ্য সংরক্ষণ করা। প্রতিটি এনআইডি কার্ড-হোল্ডারকে একটি ভোটার অ্যাকাউন্ট হিসাবে বিবেচনা করলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে (যেমন, বিকাশ, নগদ, ইউ-ক্যাশ, সেল ফিন বা অন্য কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) খুব সহজেই প্রতিটি ভোটার তাদের সুবিধা মতো পাসওয়ার্ড বা পিন নাম্বার ব্যবহার করে তার পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট প্রদান করতে পারবে। এনআইডির মাধ্যমে এ ধরনের মতামত প্রদানে (যেমন মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং) বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বের সমস্ত শ্রেনি ও পেশার মানুষ অভ্যস্ত। এই ব্যবস্থায় যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কারচুপি রোধ করা সম্ভব এবং এরকম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যালট পেপার বা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) প্রয়োজন হবে না।
এই ধরনের পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য ভোটিং ব্যাংক বা সার্ভার এর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার দিকটি শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারনের বৈচিত্র্যময় চরিত্র ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে, প্রত্যেক ভোটারের জন্য এনআইডি ব্যবহার করে ডিজিটাল ভোটিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দিকনির্দেশনামূলক গাইডলাইন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নিরাপত্তা, সময়ের অপচয় বা ব্যক্তিগত নানাবিধ কারণে ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোটদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে একটি ডিজিটাল ভোটিং সিস্টেম যুক্ত করে তা বাস্তবায়ন করলে এই অংশটি স্বতস্ফুর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বাংলাদেশের প্রবাসী জনগণ যারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখে যাচ্ছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থেকেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের দাবি করে আসছে। প্রস্তাবিত পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে প্রবাসীরাও বিশ্বের যে কোন অবস্থান থেকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।
এ পদ্ধতিতে প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার বা কোন ধরনের ভোট পোলিং কর্মীর প্রয়োজন হবে না। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কোন পোলিং এজেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন থাকবে না । এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ে ভোটিং সার্ভার খুলে কম সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব। সমষ্টিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন ও জনসচেতনতা মূলক প্রচারাভিযান চালাতে পারলে এই ধরনের ভোটদান সফল পদ্ধতি ও সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠবে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করবে কিনা জানি না, তবে আমরা মনে করি শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোই নয় বরং উন্নত বিশ্বও তাদের ভোটদান ব্যবস্থায় এ ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করবে। যারা আন্তরিকভাবে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন নির্বাচন প্রত্যাশা করেন তারা ইস্যুটি নিয়ে ভাবতে পারেন। এই ব্যবস্থা গৃহীত হলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রতিবার যে সমস্যা সৃষ্টি হয় তা দূর হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ হবে মসৃণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাহীন পথে হাটবে।