জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৩ ১১:০৮ এএম
করোনা মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব এখনও সামলে উঠতে পারেনি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। বৈরী পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে দেশগুলোর শিল্প খাত। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন করে ঋণ বিতরণের হার কমে গেছে। এর পাশাপাশি কমেছে আদায়ও। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে শিল্প খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। তবে গত বছরের শেষ প্রান্তিক বা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে যার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
হিসাব অনুযায়ী, তিন মাসের ব্যবধানে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এই খাতের ঋণ বিতরণ। এ খাতে ঋণ বিতরণ কমে গেলে নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা কমে যায় বলে মত বিশ্লেষকদের।
আলোচ্য সময়ে শিল্প খাতের ঋণ আদায় হ্রাস পেয়েছে ৩৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কেননা এই তিন মাসে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। কিন্তু আগের তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছিলেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, শিল্প খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে গেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৩ কোটি টাকা। তবে আগের প্রান্তিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮১৩ কোটি। অর্থাৎ তিন মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ মুহূর্তে শিল্পঋণের মোট বকেয়া স্থিতি ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কারণ ডিসেম্বরে শিল্পঋণের বকেয়া স্থিতি ছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঘুরেফিরে ঋণ পাচ্ছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সহনীয় বলে ধরা হয়। এর বেশি হলেই তা ঝুঁকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ মাস শেষে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৭ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ খেলাপি। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আলোচিত সময় ঋণ বিতরণের অঙ্ক ১১ লাখ ৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এ খাতে খেলাপি ঋণ ৬৫ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪১ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ খেলাপি এবং বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলোর ৩৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ৪ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পেলে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। জনগণের নতুন নতুন আয়ের উৎস তৈরি হয়। কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তবে ঋণ কতটা আদায় হচ্ছে, এটাই প্রধান বিষয়। ঋণ আদায় না হলে এ খাতের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, কয়েক যুগ ধরে শিল্প খাতে যাচাই-বাছাই ছাড়া অনেক ঋণ দেওয়া হয়েছে; যা এখনও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ খাতে ঋণ বিতরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মত এই জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের।