বাঁশ ও বেত শিল্পে দুর্দিন
এমএ হান্নান
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৩ ১১:৩৭ এএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩ ১৪:০০ পিএম
গৃহস্থালির কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়লেও চাহিদা আছে বাঁশ ও বেতপণ্যের
দেশ ও বিদেশের বাজারে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় মূলধন ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে এ চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না বাঁশ ও বেত শিল্পের কারিগররা। অনেকেই প্রতিকূল পরিবেশেও পেশা ধরে রেখেছেন। অনেকে আবার মূলধনের অভাবে অন্য পেশায় চলে গেছেন। সব মিলিয়ে ভালো নেই এ পেশার সঙ্গে জড়িতরা।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশ ও বেত শিল্পের কারিগররা বলছেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, দক্ষ জনবল তৈরি ও আধুনিক প্রশিক্ষণ পেলে দুর্দিন কাটিয়ে উঠবে বাঁশ ও বেত শিল্প।
নিতাই সিকদার, বয়স ৬৫, বাড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলবিলাস গ্রামে। প্রায় ৫০ বছর ধরে বাঁশ ও বেত দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি করে আসছেন। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে এ পেশায় কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের স্থানীয় বাজারে বেশ কদর রয়েছে। তা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররাও অর্ডার নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে জিনিসপত্র তৈরি করতে পারছি না। বাঁশ ও বেত শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি। অন্য কারিগরদের সঙ্গে কথা হলে তাদের কথায়ও উঠে আসে মূলধনের প্রসঙ্গ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাউফল উপজেলার সাবুপুরা, নগরের হাট, আদাবাড়িয়া, বড় ডালিমা, বিলবিলাস, বাহির দাশপাড়া ও কালাইয়া গ্রামে প্রায় দেড়শ পরিবার বাঁশ ও বেত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এসব পরিবারের প্রায় শতাধিক নারী ও পুরুষ বাঁশ ও বেত দিয়ে সাজি, ডালা, ডোলা, ওড়া, মোড়া, কুলা, চালন, ঢাকনা, ঝুড়ি, খাঁচা, পলো, চাঁই ও খাড়াই তৈরির কাজ করে থাকেন। অনেকে আবার বাঁশ ও বেত দিয়ে শৌখিন ও বাহারি শোপিসও তৈরি করেন। এসব জিনিসপত্র কালাইয়া, বগা ও কালিশুরী বন্দরসহ স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকেন। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা পাইকারি মূল্যে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান।

কয়েক বছর ধরে ঘর ও গৃহস্থালির কাজে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে। এ পেশার প্রধান উপকরণ বাঁশ ও বেতসহ অন্যান্য উপকরণের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগের তুলনায় বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয়। যার কারণে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাদের একজন সাবুপুরা গ্রামের কমল মালী। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে আগের মতো বাঁশ ও বেত পাওয়া যায় না। দামও অনেক বেশি। প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন। টাকার অভাবে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করেছি।
বাঁশ ও বেত শিল্পে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। অধিকাংশই সংসারের কাজের পাশাপাশি এ কাজ করে থাকেন। এমনই একজন বিলবিলাস গ্রামের সেবিকা রাণী। তিনি জানান, ছেলেমেয়ে নিয়ে পাঁচজনের সংসার। স্বামী শ্রমিকের কাজ করেন। একার আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। কয়েক বছর ধরেবাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করি। ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে পরিবারে সচ্ছলতা ফিরেছে। বড় ডালিমা গ্রামের বিচ্ছেদিনী ঘোরামী স্বামীর এই কাজে সহায়তা করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে আমিও বাঁশ দিয়ে সাজি-ডালার খাঁচা তৈরি করি। এসব মালামাল বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে। তবে কোনো পুঁজি থাকে না।’
পটুয়াখালী জেলা বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ভা.) মো. আল আমিন বলেন, ‘বাঁশ ও বেত শিল্পের উন্নয়নে বিসিক কাজ করে যাচ্ছে। বাউফল উপজেলার বাঁশ ও বেত শিল্পপল্লীগুলো পরিদর্শন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান ও কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।