জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৩ ১৪:২৯ পিএম
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ না নিয়ে সরকার বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে। গত তিন মাসে সরকার বিদেশি ঋণ নিয়েছে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে গত তিন মাসে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ কমেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। মূলত দেশীয় ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকটের কারণেই সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নানা শর্তের বেড়াজাল এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান কমে যাওয়ায় সুদহার বৃদ্ধির কারণে বিদেশি ঋণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি বা ৯৫.৭১ বিলিয়ন ডলার। এর বেশিরভাগই সরকারের দায়। অঙ্কে যার পরিমাণ ৬১.৮৯ বিলিয়ন ডলার। তবে তিন মাস আগে এসব ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০.৭৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১.১ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ছিল ২ হাজার ২১৮ কোটি বা ২২.১৮ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বরে যা ছিল ২৪.৩১ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কমেছে। অনুকূল নয়- এমন সব শর্তের কারণে এই খাতে বিদেশি ঋণ কমেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সে সময় ডলারের মজুদ ধরে রাখার কারণে আমাদের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে বৈশ্বিক রেটিং এজেন্সি মুডিজ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের রেটিং কমিয়ে দেয়। এরই মধ্যে বিদেশে সুদের হার অনেক বেড়েছে। মুডিজের ডাউনগ্রেড ও দেশের সুনামহানির কারণে বাংলাদেশি ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার আরও বেশি হয়েছে। টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নের পাশাপাশি বিদেশি ঋণ দেশের বেসরকারি খাতের জন্য খুব বেশি সুবিধাজনক নাও হতে পারে বলে মত এই অর্থনীতিবিদের।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক ঋণের ওপর। বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার আগে কয়েকবার ভাবছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। কারণ একটা সময় দেশের ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম সুদে ঋণ পাওয়া যেত বিদেশি উৎস থেকে। ডলারের দাম বাড়ার কারণে এখন সেসব ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে দ্বিগুণেরও বেশি। তাই এখন ধীর চলো নীতি অবলম্বন করেছেন দেশের উদ্যোক্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিদেশি উৎস থেকে বাংলাদেশের ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়েও এ সময়ে বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বেসরকারি খাতে। ২০১৬ সাল শেষে বিদেশি উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার। তবে গত বছরের (২০২২) ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বিদেশি ঋণ ছিল সে সময়। মার্চ শেষে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বিদেশি ঋণের এই বোঝা। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের ৭৪ শতাংশ সরকারের। বাকি ২৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে বিদেশ থেকে পাওয়া বেসরকারি খাতের এসব ঋণের বেশিরভাগই বায়ার্স ক্রেডিট। গত দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বায়ার্স ক্রেডিট (সরবরাহকারী ঋণ)। ২০২০ সালের জুনে বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ ছিল ৪৬৮ কোটি ডলার। ২০২১ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬৩ কোটি ডলার ও ২০২২ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৫৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ দুই বছরে বায়ার্স ক্রেডিট বেড়েছে ৫১০ কোটি ডলার বা ১০৯ শতাংশ। ২০২৩ সালের মার্চে বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ ৮১৩ কোটিতে নেমে এসেছে।
বায়ার্স ক্রেডিটের এ ঋণ সাধারণত এক বছরের মধ্যে শোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বায়ার্স ক্রেডিট হচ্ছে দেশের আমদানিকারকের বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণ। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এসব ঋণ নিয়ে থাকেন। দুইভাবে বায়ার্স ক্রেডিট নেওয়া হয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার অংশ হিসেবে আমদানিকারককে বাকিতে পণ্য সরবরাহ করে, যা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমদানিকারককে পণ্য বুঝে পাওয়ার ছয় মাস পর ঋণ পরিশোধ করতে হয়। আবার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানিকারককে ঋণের ব্যবস্থা করে পণ্যটি সরবরাহ করেন। এতে রপ্তানিকারক অর্থ পেয়ে যান। কিন্তু আমদানিকারক পরে ব্যাংককে ঋণ শোধ করেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য এসব ঋণের জোগান দিয়ে থাকে।