নড়াইল প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৩ ১৫:৪৩ পিএম
লোহাগড়ার চরের জমি থেকে বাদাম সংগ্রহ করছে কৃষক। প্রবা ফটো
নড়াইলের লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীভাঙন থেকে নতুন কিছু চরের সৃষ্টি হয়েছে। এই চরগুলোতে বাদাম চাষ করে চাষিদের ভাগ্য বদলাচ্ছে। স্বল্প খরচে ভালো ফলন ও অধিক লাভ হওয়ায় নদীতীরবর্তী কৃষকরা বাদাম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
নদীভাঙনে নিঃস্ব প্রান্তিক চাষিরা বাদাম চাষে লাভবান হয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছেন। স্থানীয় বাদামচাষিরা জানান, সাধারণত বেলে ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে বাদামের ফলন ভালো হয়। নতুন চরের মাটি বাদাম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এই মাটিতে অন্য কোনো ফসলের চাষ করলে ফলন ভালো হয় না। তাই নতুন চরের প্রথম তিন বছর শুধু বাদাম চাষ করতে হয়। টানা তিন বছর ধরে বাদাম চাষের পর অন্য ফসল চাষের জন্য এই চরের মাটি উপযোগী হয়ে ওঠে।
প্রতিবছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বাদামের আবাদ শুরু হয় এবং মে-জুন মাসে জমি থেকে বাদাম উত্তোলন করা হয়। লোহাগড়া উপজেলার মণ্ডলবাগ গ্রামের বাদামচাষি ভুলু মিয়া জানান, কৃষিজমির সবটুকু নদীতে চলে যাওয়ার পর হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তখন অনেক কষ্টে সংসার চলেছে। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে বাদাম চাষ করে একটু ভালো আছি। এ বছর এক একর জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। খরচ বাদ দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
আরেক বাদামচাষি বাবু মিয়া বলেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে বাবার রেখে যাওয়া প্রায় দশ একর জমি মধুমতী নদীগর্ভে চলে গেছে। জমিজমা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলাম। বছর দুই হলো কিছু জমিতে চর জেগেছে। চরের জমিতে বাদাম ছাড়া অন্য ফসল হয় না। দুই বছর হলো বাদাম চাষ করছি। গত বছরও ভালো ফলন হয়েছিল। চলতি বছরও বাদামের ভালো ফলন হয়েছে।
কৃষক তজিবর শেখ বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে খরচ কম লাভ বেশি। তার ভাষায় বাদাম চাষ নদীভাঙন এলাকার কৃষকের জন্য আল্লাহর নিয়ামত।
কালিয়া উপজেলার নোয়াগ্রামের কৃষক জুয়েল মৃদ্দা জানান, নতুন চর জাগা জমিতে তিন-চার বছর বাদামের আবাদ ভালো হয়, পরে সেই জমিতে বাদামের আবাদ তেমন ভালো হয় না। তবে তিন-চার বছর বাদাম চাষ করা হলে সেই জমিতে পরবর্তী বছর অন্যান্য ফসল ভালো হয়।
হাবরা-হাচলা গ্রামের কৃষক আলমগীর জানান, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছরই বাদামের আবাদ করেন। চলতি বছরে প্রায় তিন একর জমিতে বাদামের আবাদ করে ৭০-৭২ মণ বাদাম পেয়েছেন। এ বছর তিনি তিন লাখ টাকারও বেশি লাভ হবে বলে আশা করছেন।
বাদাম ব্যবসায়ীরা বলছেন, নড়াইল জেলার বাদাম অনেক সুস্বাদু। এই বাদামের সুনাম ও চাহিদা রয়েছে বেশ কয়েকটি জেলায়। বর্তমানে এক মণ বাদাম ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী লিটন শেখ বলেন, প্রতিবছর তিনি নড়াইল থেকে বাদাম কিনে সিলেট, রংপুর, চিটাগং ও ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় বিক্রি করেন। লাভও ভালো হয়।
নড়াইল কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন চর জাগা মাটিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ অন্যান্য ফসল হয় না। বাদাম চাষ ভালো হয়। পরপর তিন বছর জমিতে বাদাম চাষ করলে মাটির গুণাগুণ ফিরে আসে। তিন বছর বাদাম চাষ করার পর সেই জমিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদের উপযোগী হয়। জেলায় এ বছর ৩৫০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চরের পরিধি বেড়ে ৩৯৩ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। নড়াইলের তিনটি উপজেলার মধ্যে লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলায় বাদামের আবাদ হয়। নড়াইল জেলায় চলতি বছর ৭৪৪ টন বাদাম উৎপাদন হয়।
নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক দীপক কুমার রায় বলেন, জেলায় সাধারণত বারী চীনা বাদাম-৮, বারী-৯ এবং চীনা বাদাম-৪ জাতের বাদাম বেশি চাষ হয়। নদীতীরবর্তী এলাকা বাদাম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। সাধারণত বেলে ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে বাদাম চাষ হয়। আমরা সবসময় কৃষকের পাশে থেকে তাদের এ চাষে সহযোগিতা করি। অন্যান্য ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে বেশি লাভ। চলতি বছর ৯০০ জন বাদামচাষির মধ্যে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ করা হয়েছে। মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ চর এলাকায় বাদাম চাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সবসময় কৃষকের পাশে ছিল। চরের মাটিতে বাদাম চাষ লাভজনক হওয়ায় দিন দিন চাষিদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। চরাঞ্চলের জনপদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাদাম চাষ ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলো বাদাম চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলেও জানান এই কৃষিবিদ।